দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে উপাচার্য বদলের ঘটনা ঘটেছে ব্যাপক হারে। গত দুই বছরেই অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনবার উপাচার্য পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক তৎপরতার’ অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত চলছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, উচ্চশিক্ষার আঙিনায় দলীয় রাজনীতির প্রভাব আগের মতোই প্রবল।
তবে বর্তমান সময়ে নতুন এক সংকটের জন্ম দিয়েছে শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের আচরণ। এই অস্থিরতা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং স্কুল ও কলেজের মতো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বরাবরই একটি প্রবণতা দেখা যায় যে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। অন্যদিকে, শিক্ষকদের একটি অংশ সুবিধাবাদী হয়ে দলীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকে। তাঁদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুনরায় দলীয় রাজনীতির কবলে চলে যাওয়ার সেই পুরনো দিনগুলোতে ফিরে যাচ্ছে। এর ফলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটছে, যা সরাসরি শিক্ষার পরিবেশ ও পড়াশোনার ক্ষতি করছে।
এমন এক বাস্তব পরিস্থিতির মাঝে আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। শিক্ষকদের পেশাগত সুরক্ষা, মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এবারের দিবসটি উদ্যাপিত হচ্ছে। এই বিশেষ দিনে সরকার ১০০ জন শিক্ষককে সম্মাননা প্রদান করবে। তবে শিক্ষকদের মর্যাদা ও স্বাধীনতার কথা স্মরণ করার এই দিনে একটি বড় প্রশ্ন সামনে দাঁড়িয়েছে—শিক্ষক রাজনীতি কি কেবল অধিকার ও পেশাগত স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম হবে, নাকি তা পদপদবি ও ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এই পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে বলেছেন, “প্রথমত, সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পছন্দের লোক বসাতে চায়। দ্বিতীয়ত, অল্পসংখ্যক শিক্ষক পদপদবির জন্য সরকারের আনুকূল্য চাইতে থাকেন। এভাবেই দলবাজির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”
সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মূলত আওয়ামীপন্থী শিক্ষকেরাই উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হতেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগপ্রাপ্ত সব উপাচার্য মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন। এরপর বিএনপি ও জামায়াতপন্থী শিক্ষকেরা সেই চেয়ারগুলোতে বসেন।
বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের সরিয়ে ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের প্রায় সবাই বিএনপিপন্থী শিক্ষক রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। অর্থাৎ, পুরোনো ধারাবাহিকতাই চলছে। আলোচনা রয়েছে যে, সাধারণ শিক্ষকদের বড় অংশ এমনটা চান না, কিন্তু মুষ্টিমেয় শিক্ষকের অতিরাজনীতির প্রভাব পুরো শিক্ষাঙ্গনে পড়ছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও সংগঠনের অধিকার সবার থাকলেও সমস্যা তৈরি হয় যখন রাজনৈতিক পরিচয় পেশাগত যোগ্যতাকে ছাপিয়ে যায়। উপাচার্য নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি বা প্রশাসনিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয় বড় হয়ে উঠলে পুরো প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়।
শিক্ষকদের দাবি, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তবে শারীরিক হেনস্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্ত, তালিকা তৈরি, বরখাস্ত, দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া, পদত্যাগে বাধ্য করা কিংবা হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ বা প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে। কিছু ঘটনায় শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও পদপদবি দখলের প্রতিযোগিতার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
গত ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক শিক্ষককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। গত জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে আসা এক শিক্ষককে শারীরিক হেনস্তার পর টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। শিক্ষকেরা আবারও বলছেন, “কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু শারীরিকভাবে হেনস্তা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিন্ডিকেট সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিনাত হুদাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে জিনাত হুদাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
তবে এই বরখাস্তের বিষয়ে অধ্যাপক জিনাত হুদা মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, “তাঁর বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের একটিও তারা প্রমাণ করতে পারেনি। শিক্ষক সমিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই এটি করা হয়েছে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভাগ বা ইনস্টিটিউট খুলে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে পদের অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৩২ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৬০ জনের বেশি শিক্ষক বিভাগীয় সিদ্ধান্তে বা নিজ উদ্যোগে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত ছিলেন।
এদিকে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের ২৩১ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। ‘গোপন তৎপরতায় লিপ্ত’ থাকার অভিযোগে গত ১৩ আগস্ট তিন সদস্যের কমিটি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের ‘গোপন তৎপরতায়’ যুক্ত থাকার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন শিক্ষকের নাম থাকার কথা বলা হয়। তাঁদের মধ্যে ৫৮ জনের নাম শনাক্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।” এ ছাড়া ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত ও তদন্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’। তবে আওয়ামী লীগ আমলের অতিমাত্রায় দলবাজির সমালোচনাও রয়েছে। অভিযোগ ছিল, যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় শিক্ষার মান ব্যাহত হয়েছে। এমনকি খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপাচার্য অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি করে নিজের ছেলে, মেয়ে, শ্যালক-শ্যালিকার ছেলে ও ভাতিজাসহ পরিবারের নয়জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকেও অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও তা সফল হয়নি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন অভিযোগে ৩৮ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত, তিন শিক্ষকসহ ১৭ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ১১ শিক্ষককে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের চাপে আওয়ামীপন্থী ছয় ডিনকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া অভ্যুত্থানবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রায় ৩০০ শিক্ষকের তালিকা উপাচার্যের কাছে দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী, জগন্নাথ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি উচ্চ আদালতেও পৌঁছেছে। ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং, অনুসন্ধান বা তদন্ত কমিটি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২১ সেপ্টেম্বর একটি রিটের প্রাথমিক শুনানিতে এই রুল দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই বছরে শিক্ষকদের ঘিরে অন্তত ছয়টি ঘটনায় উত্তেজনা, বিক্ষোভ, হেনস্তা, তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত ও মদদ দেওয়ার অভিযোগে ১৯ জন আওয়ামীপন্থী শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে, যার ভিত্তিতে ১০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের আপত্তির কারণে তা এখনো অনিষ্পন্ন।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও সহকারী অধ্যাপক ফারহানা খানম ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট মবের শিকার হয়ে পদত্যাগ করেন। পরে তাঁরা আদালতের আশ্রয় নেন, তবে বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বেসরকারি স্কুল-কলেজেও সরকার পরিবর্তনের পর ‘মব’ করে শিক্ষকদের হেনস্তা ও জোরপূর্বক পদত্যাগের বহু ঘটনা ঘটেছে, যার সঠিক তথ্য সরকারি দপ্তরে নেই।
জোরপূর্বক পদত্যাগ, অপসারণ ও বরখাস্তের শিকার শিক্ষকদের নিয়ে ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। এই সংগঠনের আহ্বায়ক আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার জানান, তিনি ধামরাইয়ের সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাঁকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়। তিনি আরও জানান, তাঁদের সংগঠনে এমন ভুক্তভোগী শিক্ষকের সংখ্যা ৩০০। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ৯৫০ জন শিক্ষকের এমপিও বন্ধ আছে এবং সাড়ে চার হাজার শিক্ষকের বেতন বন্ধ রয়েছে।
ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ বেদারউদ্দিন আহমেদকেও জোর করে পদত্যাগ করানো হয়। ২০২৫ সালের মার্চে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর পদত্যাগ সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সঠিক হয়নি এবং বর্তমান অধ্যক্ষ কাজী নেয়ামুল হকের নিয়োগ বৈধ না হওয়ায় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এখনো কোনো ব্যবস্থা হয়নি এবং বেদারউদ্দিন আহমেদ আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে এই কলেজের শিক্ষক কায়কোবাদ সরকারসহ আরও ছয়জন শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়েছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পুনর্বহালের নির্দেশ দিলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ তা মানছে না বলে এক শিক্ষক মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপি—সব সরকারের আমলেই শিক্ষকদের দলবাজির ঘটনা ঘটেছে। এতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না। তবে দলবাজির সমালোচনার পাশাপাশি অপরাধের জবাবদিহির সুযোগ থাকা উচিত। হামলা, সহিংসতা, দুর্নীতি বা বিধিভঙ্গের সাথে জড়িত থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। তবে দলবাজি অবশ্যই বন্ধ হতে হবে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের চেয়ে রাজনীতিতে বেশি সক্রিয় থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত, যা শিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের রাজনীতি বন্ধ করতে আচরণবিধি করার চিন্তা আছে সরকারের। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিত।”
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতেও দলীয় ছায়ার প্রভাব রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আত্মীয়স্বজন বা অনুসারীরা বিভিন্ন পদে বসছেন এবং আর্থিক লাভের সুযোগ খোঁজার অভিযোগ রয়েছে। আগে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরিচালনা কমিটি দিলেও এখন তা এনটিআরসিএর মাধ্যমে হচ্ছে। অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগেও এনটিআরসিএর প্রক্রিয়া চালু হচ্ছে।
বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের শতভাগই সরকারের কাছ থেকে পান। কম হলেও কিছু ভাতাও পান। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজন নেই।”
সার্বিক বিষয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সহজ উপায় হলো যথার্থ ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, যেখানে বর্তমানে বড় ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতাও কম হওয়ায় অনেকে কোচিং ও প্রাইভেটের দিকে ঝুঁকছেন। তিনি মনে করেন, দলবাজি বন্ধ করতে হবে এবং এর জন্য শুধু শিক্ষকদের নয়, সরকারের দায় বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন রাখা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব গঠন করে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই গণতান্ত্রিক মডেল আর নেই।