ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বন্দির চাপে চরম সংকটের মুখে পড়েছে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার। ১ হাজার ৫০০ বন্দির ধারণক্ষমতা থাকা এই কারাগারটিতে গত রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে বন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জনে।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওইদিন রাত ১১টা পর্যন্ত বন্দির সংখ্যা আরও বেড়ে ৩ হাজার ৬১০ জনে পৌঁছেছে। অতিরিক্ত বন্দির এই চাপে কারাগারের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কার্যক্রমে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অত্যন্ত সংকীর্ণ জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে বন্দিদের, যা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কারাগার সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কুমিল্লা নগরীসহ জেলার ১৮টি থানায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদার করার ফলে বন্দির সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরদের একটি বড় অংশ প্রাথমিক পর্যায়ে এই কারাগারে আনা হয়েছিল।

কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খান জানান, চলমান অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ৫০ কিশোরের মধ্যে আদালতের নির্দেশে ২৭ জনকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ রোববার সকালে আরও দুই কিশোরকে সেখানে পাঠানো হয়।

কারাগার সূত্রে আরও জানা যায়, কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আসা কিশোরদের মধ্যে যাদের দ্রুত জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হচ্ছে। তবে এর মধ্যে কয়েকজন কিশোর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

জেলা পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে কুমিল্লা নগরীসহ জেলার ১৮টি থানায় কিশোর গ্যাংবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হয়। শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত পরিচালিত পৃথক অভিযানে দুই সহস্রাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যসহ মাদক ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৩৩ জনকে আদালতে পাঠানো হয়। অন্যদিকে, যাচাই-বাছাই শেষে মুচলেকার বিনিময়ে ১ হাজার ২০৯ জনকে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, যাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে।

একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক আসামিকে কারাগারে পাঠানোর ফলে বন্দির চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ২ হাজার অতিরিক্ত বন্দি এখানে অবস্থান করছেন। এর ফলে বন্দিদের থাকার জায়গা, খাবার সরবরাহ, গোসল এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় চরম চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খান বলেন, ‘কষ্ট করে হলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। কারাগারে চারটি নতুন বহুতল ভবন উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। ভবনগুলো চালু হলে বন্দীদের থাকার সমস্যা থাকবে না।’

উল্লেখ্য, কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী এই অভিযান জোরদারের পেছনে বেশ কিছু আলোচিত ঘটনার প্রভাব রয়েছে। এর মধ্যে গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড. নাহিদা বেগমের ছেলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনাটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে দুই কিশোরকে গত ২১ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এই ঘটনার পর থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে পুলিশ ধারাবাহিক অভিযান শুরু করে।

পুলিশের দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রেপ্তার হওয়ায় একদিকে যেমন কারাগারে বন্দির চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে আটক কিশোরদের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে শিশু আইন ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

কারা কর্তৃপক্ষ আশা করছেন, নতুন বহুতল ভবনগুলো দ্রুত চালু হলে অতিরিক্ত বন্দিদের আবাসনসংকট অনেকটা লাঘব হবে।