কুষ্টিয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা চালানো হয়েছে। আজ রোববার সন্ধ্যায় কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত লালন আখড়াবাড়িতে এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর দিকে ডিম নিক্ষেপ করা হয় এবং তাঁকে বহনকারী গাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়।
হামলার পর মামলা করতে গিয়ে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হন এনসিপি নেতা-কর্মীরা। থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে সেখানে উপস্থিত বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের তীব্র বাধার মুখে পড়েন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত মামলা দায়ের না করেই রাত ১২টার দিকে ওসির গাড়িসহ আরও একটি গাড়িতে করে কুমারখালী থানা ত্যাগ করেন এনসিপির প্রতিনিধিরা।
ঘটনার বিষয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) আমিনুল ইসলাম আজ রাত আটটার দিকে মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে গাড়ি ভাঙচুরের বিষয়টি জানা নেই। তিনি (নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী) কখন, কেন এসেছেন, সেটা জানতাম না। ঘটনার পর তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। সেখানে আরও পুলিশ যাচ্ছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই হামলার একাধিক ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং ভেড়ামারা উপজেলা এনসিপির সদস্যসচিব শোভন আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ কয়েকজন ব্যক্তিগতভাবে লালন আখড়াবাড়িসহ কুষ্টিয়ার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করেন। বিকেলে শিলাইদহ ঘুরে সন্ধ্যায় লালন আখড়াবাড়িতে আসেন। সেখানে আখড়াবাড়িতে গান শুনে বের হচ্ছিলেন। এ সময় দুজন নারী তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁকে (নাসীরুদ্দীন) উদ্দেশ করে একজন ডিম ছোড়ে।’
শোভন আহমেদ আরও বর্ণনা করেন, ‘এর পরপরই ২০–২৫ জন এসে উচ্চ স্বরে গালাগালি করতে থাকে। একজন বলতে থাকে, “তুই এখানে কেন আসছিস?” এরপর তাঁকে মারতে উদ্যত হয়। তাঁকে রক্ষা করতে নেতা–কর্মীরা ঘিরে ধরেন। হামলাকারীদের হাতে লাঠিসোঁটা ছিল। আমাদের কয়েকজন নেতা আহত হয়েছেন। দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে সব ঘটনা ঘটে যায়। এরপর আখড়া বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে থাকা গাড়িতে ইট মেরে গ্লাস ভেঙে দেয় তারা।’
এই ঘটনার জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করেছেন এনসিপি কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্যসচিব সুলতান মারুফ তালহা। তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাই এই হামলাটি চালিয়েছেন এবং এ বিষয়ে থানায় মামলা করা হবে। তবে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বী। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নাসীরুদ্দীনের ওপর যদি হামলা হয়ে থাকে, তবে সেটা অবশ্যই নিন্দনীয়। ছাত্রদল মব কালচারের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। হামলার ঘটনার সঙ্গে ছাত্রদল কোনোভাবেই জড়িত থাকতে পারে না।’
মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ জটিল। রাত সাড়ে ৯টার দিকে এনসিপির নেতা-কর্মীরা কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিনের কক্ষে প্রবেশ করেন। তবে তার আগে রাত ৯টার দিকেই ওসি সাহেবের কক্ষে কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব আবু কাউছারসহ অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী অবস্থান নিয়েছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনসিপির নেতারা কক্ষে প্রবেশের ৫ থেকে ৭ মিনিট পর বিএনপির নেতা-কর্মীরা কক্ষ ত্যাগ করে থানা প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন। সেই সময় ওসি সাহেবও কক্ষ ছেড়ে বাইরে যান এবং এনসিপি নেতারা ভেতরে বসে থাকেন। পরবর্তীতে ওসি পুনরায় কক্ষে প্রবেশ করে মোবাইলফোনে কথা বলতে থাকেন এবং মামলা নেওয়ার বিষয়ে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
রাত ১১টা পর্যন্ত প্রতিবেদনটি লেখা সেই মুহূর্ত পর্যন্ত এনসিপির নেতা-কর্মীরা থানার ভেতরে এবং বিএনপির নেতা-কর্মীরা বাইরে অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর এই হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে জেলা জামায়াতে ইসলামী।