অবৈধ অভিবাসন এবং নানা ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিলের সরকারি প্রজ্ঞাপনটি বহাল রয়েছে। হাইকোর্ট এর আগে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ওই প্রজ্ঞাপনের কার্যক্রম স্থগিত করলেও, আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই স্থগিতাদেশ বাতিল করেছেন। আজ রোববার চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক এই আদেশ প্রদান করেন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন নিউ এজ ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। সেই রিটের প্রেক্ষিতে আদালত লাইসেন্স প্রত্যাহারের সরকারি প্রজ্ঞাপনটির কার্যকারিতা স্থগিত করে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে 'লিভ টু আপিল' বা আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করে। আজকের কার্যতালিকায় আবেদনটি উঠলে শুনানি শেষে আদালত স্থগিতাদেশটি তুলে নেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান।

আদালত কার্যক্রম শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল হচ্ছে মালয়েশিয়া।…দেশের মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে নির্ধারিত ফিসের বাইরেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়, এক কাজের কথা বলে অন্য কাজ, ভুয়া ভিসা দেওয়া—এ ধরনের নানা রকম অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার একেবারে ধসে পড়েছিল।…যারা এই অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে সেই মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।’

তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৯ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার করা হয়। যেসব এজেন্সির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ছিল এবং যাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে, তাদের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আইন অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে এই আদেশের বিরুদ্ধে একটি এজেন্সি রিট করলে ১৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। ফলে লাইসেন্স প্রত্যাহারের সরকারি সিদ্ধান্তটি সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে আপিল বিভাগে আবেদন করা হলে ৩০ সেপ্টেম্বর চেম্বার আদালত হাইকোর্টের সেই আদেশ স্থগিত করেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও উল্লেখ করেন যে, পরবর্তীতে আরও ১১টি এজেন্সি পৃথক রিট করে অবকাশকালীন বেঞ্চ থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুততার সাথে আপিল বিভাগে আবেদন করলে চেম্বার আদালত সেই আদেশের কার্যকারিতাও স্থগিত করেন। এর ফলে ১৯ জুলাই সরকারের পক্ষ থেকে যে ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার করা হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তটিই এখন চূড়ান্তভাবে বহাল থাকল।

উল্লেখ্য, গত ১৯ জুলাই প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন-২০১৩, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) আইন-২০২৩ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন ও বিধিবিধান মেনে চলা বাধ্যতামূলক। কিন্তু লাইসেন্স বাতিল করা এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৬, ৪২০, ৩৮৫, ৩৮৬, ৪২৭ ও ৩৪ ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং আদালত তা গ্রহণ করেছেন। এই আইনি প্রক্রিয়ার কারণেই অভিবাসী আইন অনুযায়ী লাইসেন্সগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে।

লাইসেন্স বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা। আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী ও মেয়ের মালিকানাধীন দুটি এজেন্সি অরবিটালস এন্টারপ্রাইজ ও অরবিটাল ইন্টারন্যাশনাল। এছাড়া ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদের আহমেদ ইন্টারন্যাশনাল, ফেনী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেড এবং ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদউদ্দিন চৌধুরীর ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল।

তালিকায় আরও রয়েছে জনশক্তি খাতের আলোচিত ব্যবসায়ী নূর আলীর ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড এবং মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য রুহুল আমিন ওরফে স্বপনের ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল।

এছাড়া মেসার্স শাহীন ট্রাভেলস, আরভিং এন্টারপ্রাইজ, হৃদয় ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল, জাহরাত ইন্টারন্যাশনাল, ৪ সাইট ইন্টারন্যাশনাল, বিনিময় ইন্টারন্যাশনাল, আকাশভ্রমণ লিমিটেড, কিউ কে কুইক এক্সপ্রেস লিমিটেড, ইউনাইটেড এক্সপোর্ট লিমিটেড, জিএমজি ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেড, সাদিয়া ইন্টারন্যাশনাল, দ্য সুপার ইস্টার্ন লিমিটেড, এলিগ্যান্টস ওভারসিজ লিমিটেড, মিডওয়ে ওভারসিজ লিমিটেড, মদিনা ওভারসিজ, আল খামিস ইন্টারন্যাশনাল, নিউ এজ ইন্টারন্যাশনাল, দামাশি করপোরেশন লিমিটেড, গ্যালাক্সি করপোরেশন, সুলতান ওভারসিজ, প্রভাতী ইন্টারন্যাশনাল, মানিসপাওয়ার করপোরেশন, আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, আইএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, দরবার গ্লোবাল ওভারসিজ, নাতাশা ওভারসিজ, অপরাজিতা ওভারসিজ, স্ট্যানফোর্ড এমপ্লয়মেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড, জান্নাত ওভারসিজ, বিএম ট্রাভেলস, বিএনএস ওভারসিজ লিমিটেড, রুবেল বাংলাদেশ লিমিটেড, ট্রান্স এশিয়া ইন্টিগ্রেট সার্ভিসেস লিমিটেড, আল ফারাহ হিউম্যান রিসোর্সেস অ্যান্ড কনসালট্যান্সি, ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল, থানেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, জেজি আলফালাহ ম্যানেজমেন্ট, ইমপিরিয়াল রিসোর্সেস লিমিটেড, পি আর ওভারসিজ লিমিটেড, এমইএফ গ্লোবাল বাংলাদেশ লিমিটেড ও অনন্য অপূর্ব রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার করা হয়েছে।