ক্রোয়েশিয়ার মাটিতে ইংল্যান্ডের সাত গোলের দাপট। আর কয়েক ঘণ্টা পরেই বুয়েনস আইরেসে আর্জেন্টিনার হয়েও এলো সাত গোল। রিয়েকা ও মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের দুই ম্যাচের শেষ দৃশ্য ছিল প্রায় এক; স্কোরবোর্ডের এক পাশে সাত, আর অন্য পাশে শূন্য। ইংল্যান্ডের কাছে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে ক্রোয়েশিয়া, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সামনে অসহায় হয়ে পড়েছিল বুরকিনা ফাসো।
গোলবন্যার এই দুই ঘটনার পর ফুটবল প্রেমীদের মনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জাতীয় দলের ফুটবলে ঠিক সাতটি গোল করার রেকর্ড কোন দেশের সবচেয়ে বেশি? যদিও পুরনো ফুটবল রেকর্ডগুলো নিয়ে বর্তমানে নানা বিতর্ক রয়েছে, তবে জাতীয় দলের ইতিহাসের খাতা উল্টালে সবার আগে সামনে আসে জার্মানির নাম। বিশ্বের পরিচিত ফুটবল শক্তিগুলোর ম্যাচতালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জার্মানির রেকর্ডই সবচেয়ে সমৃদ্ধ।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, এই হিসাবটি করা হয়েছে কেবল সেই সব ম্যাচের, যেখানে একটি দল ঠিক সাতটি গোল করেছে। অর্থাৎ ৭-০, ৭-১, ৭-২ কিংবা ৭-৩—এমন সব ম্যাচ এখানে অন্তর্ভুক্ত। তবে আট বা তার বেশি গোলের ম্যাচগুলো এই হিসাবে ধরা হয়নি।
ফুটবল বিষয়ক ওয়েবসাইট ১১ভি১১-এর আর্কাইভ এবং আরএসএসএসএফ-এর আন্তর্জাতিক ম্যাচতালিকা অনুযায়ী, জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানি মিলিয়ে এমন ম্যাচের সংখ্যা ২১টি। এই যাত্রার শুরু হয়েছিল ১৯২৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, যখন সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ৭-১ ব্যবধানে জয়লাভ করে তারা। আর সর্বশেষটি ছিল চলতি বছরের ১৪ জুন, বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে একই স্কোরের জয়। প্রায় এক শতাব্দী ধরে জার্মানির এই সাত গোলের ধারাবাহিকতা চলে আসছে।
এই ২১টি ম্যাচের মধ্যে একটি ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসের অবিস্মরণীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, বেলো হরিজন্তে। স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে জার্মানি তখন মাত্র ২৯ মিনিটেই ৫-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি শেষ হয় ৭-১ গোলের ব্যবধানে। ওই রাতেই মিরোস্লাভ ক্লোসে বিশ্বকাপে নিজের ১৬তম গোল করে তৎকালীন সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছিলেন। একটি দলের সাত গোল কীভাবে বিশ্ব ফুটবলের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে যায়, সেই ম্যাচটিই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
জার্মানির পাশাপাশি সুইডেনও এই তালিকায় চমক দিয়েছে। তাদের ঠিক সাত গোলের ম্যাচের সংখ্যা ১৮টি। আরও কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এই ১৮টি ম্যাচের মধ্যে সাতটিতেই প্রতিপক্ষ ছিল ফিনল্যান্ড। ফলে সুইডেনের সাত গোলের ইতিহাসে প্রতিবেশী দেশটির নাম বারবার ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে, ক্রোয়েশিয়াকে হারানোর পর ইংল্যান্ডের এই ধরনের জয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩টিতে, যার ফলে তারা ব্রাজিলের সমান হলো। ইংল্যান্ডের প্রথম সাত গোলের ম্যাচটি ছিল ১৮৮৩ সালে, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ৭-০ জয়। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৯ সালে মন্টেনেগ্রো এবং ২০২৩ সালে উত্তর মেসিডোনিয়ার বিপক্ষেও একই স্কোরে জিতেছিল তারা। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো ক্রোয়েশিয়া।
সাম্প্রতিক এই সাত গোলের উৎসবে হ্যারি কেইন ও বুকায়ো সাকা দুটি করে গোল করেছেন। এই জয়টি ইংল্যান্ডের নেশনস লিগ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার জন্যও এই ফলটি ঐতিহাসিক, কারণ এত বড় ব্যবধানে তারা আগে কখনো হারেনি।
ব্রাজিলের ১৩টি সাত গোলের ম্যাচের মধ্যে ১৯৫০ বিশ্বকাপে সুইডেনকে ৭-১ গোলে হারানোর স্মৃতি অমলিন। জার্মানির বিপক্ষে সেই দুঃস্বপ্নের অনেক আগে বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রতিপক্ষের জালে সাতবার বল পাঠিয়েছিল ব্রাজিল।
আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক সাত গোলের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি। ২০২৩ সালে কুরাসাওকে ৭-০ গোলে জয়ের ম্যাচে তিনি হ্যাটট্রিক করেছিলেন। সেই ম্যাচের প্রথম গোলেই জাতীয় দলের হয়ে ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তবে এবারের বুরকিনা ফাসো ম্যাচে প্রতিপক্ষ দল ছিল মূলত অনূর্ধ্ব-২৩ ফুটবলারদের নিয়ে গঠিত। তাই একই স্কোরের আড়ালে ম্যাচের প্রেক্ষাপটটি মনে রাখা জরুরি।
অন্যান্য পরিচিত দলগুলোর মধ্যে নেদারল্যান্ডসের ঠিক সাত গোলের ম্যাচ রয়েছে নয়টি। পর্তুগাল ও উরুগুয়ের আছে সাতটি করে। ফ্রান্স ও স্পেনের চারটি এবং ইতালির তিনটি ম্যাচ এই তালিকায় রয়েছে।