ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এক মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবন বদলে গেল এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার মাধ্যমে। তিথি মালি নামের ওই শিক্ষার্থীর বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার অসাধারণ ফলাফল এবং সঠিক সময়ে সঠিক মানুষের সহায়তা তাকে উচ্চশিক্ষার পথে ফিরিয়ে আনল। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত তুরি জনগোষ্ঠীর কাজল পাড়ে তিথির বিয়ে বন্ধ করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বিয়ের জন্য জমিয়ে রাখা অর্থ ব্যয় করে মেয়েটিকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য তার বাবাকে উৎসাহিত করেন তিনি। বর্তমানে তিথি রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছেন।

আজ রোববার চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘শিখো’ ও ‘মুক্তকণ্ঠ’-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিথিকে নিয়ে আসেন কাজল পাড়ে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিথি নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমি লেখাপড়া করে বড় হতে চাই। বাবা-মায়ের দুঃখ দূর করতে চাই।’

মুক্তকণ্ঠ ও শিখোর এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কথা তিথি আগে জানতেন না। এমনকি রেজিস্ট্রেশন করার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা ছিল না। তা সত্ত্বেও কাজল পাড়ের সাথে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের শহীদ সাটু অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সংবর্ধনায় অংশ নিতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত তিথি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জীবনে কোনো দিন এমন বড় কোনো অনুষ্ঠানে আসার সুযোগ পাইনি। আর অনুষ্ঠানে কথা বলব, তা কখনো ভাবিনি। কথা বলার সময় খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু এখন খুব ভালো লাগছে। দিনটি জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

কাজল পাড়ে জানান, তিথি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ‘ভূঁইমালি’ সম্প্রদায়ের একজন শিক্ষার্থী এবং তিনি এই সম্প্রদায়ের মধ্যে এসএসসিতে প্রথম জিপিএ-৫ অর্জনকারী। নওগাঁর পোরশা উপজেলার ঘাটনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ–৫ পাওয়া একমাত্র শিক্ষার্থী তিনি। কাজল পাড়ের এক বড় বোন পোরশা উপজেলার ঘাটনগর মালিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সেখানে তিনি বিবাহিত। বোনের কাছ থেকেই তিথির সাফল্যের খবর পেয়ে তিনি ওই গ্রামে যান এবং বিয়ে বন্ধ করে উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত করেন।

এই বিষয়ে কাজল পাড়ে বলেন, ‘তিথি এবার জিপিএ-৫ না পেলে এর মধ্যেই তার বিয়ে হয়ে যেত। আর জিপিএ-৫ না পেলে আমার বড় বোনও বিয়ে আটকানোর জন্য আমাকে এ খবর দিত না। তার বিয়ে আটকানোর জন্য শিক্ষানুরাগী আমার বড় বোনের ভূমিকা বড়।’

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে কাজল পাড়ে বলেন, ‘আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার এনায়েতপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমি এমন সংবর্ধনা পাওয়ার সুযোগ পাইনি। কিন্তু আজ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে আমার খুব ভালো লাগছে।’

শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’-র পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মুক্তকণ্ঠের আয়োজনে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ৬৪ জেলায় এই সংবর্ধনা প্রদান করা হচ্ছে। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে পরিচালিত এই আয়োজনের ধারাবাহিকতায় এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

পুরো আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় ছিল কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভা।

সকাল সাড়ে আটটা থেকেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভিড় জমতে শুরু করে। কেউ ফটো ফ্রেমে ছবি তুলছিলেন, কেউবা ব্যানারের সামনে ব্যস্ত ছিলেন। এক্সপেরিয়েন্স জোনে গেম খেলে পুরস্কার জেতার প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ চারটি লাইন দেখা যায়।

সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে মুক্তকণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক আনোয়ার হোসেন। উদ্বোধনী নৃত্য পরিবেশন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক রামিজ আহমেদ অন্তর ও তাঁর দল। এছাড়া কৃতী শিক্ষার্থী আফরিনা রহমান নৃত্য পরিবেশন করেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহিলা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বিপ্লব কুমার মজুমদার, নবাবগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রওশন আরা, রাজশাহীতে মুক্তকণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, আইপিডিসি-মুক্তকণ্ঠ প্রিয় শিক্ষক সম্মাননাপ্রাপ্ত আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন, কৃতী শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান এবং এ এইচ এম মাহিমুল আজম। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভার সহসভাপতি ফারাহ উলফাৎ রহমান অর্পিতা।

অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে অতিথিরা পুরস্কার বিতরণ করেন। সাংস্কৃতিক পর্বে মহানন্দা সংগীত নিকেতনের শিল্পীদের পাশাপাশি কৃতী শিক্ষার্থী নিক্সন হাসান গান পরিবেশন করেন।