সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় মাদক ব্যবসার অভিযোগে দুটি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই ঘটনার সময় ওই বাড়িগুলোতে মাদক কিনতে আসা দুই যুবককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। গতকাল শনিবার রাতে উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের মালীর মোড়সংলগ্ন এলাকায় এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফজর আলী এবং তাঁর ভাই আইয়ুব আলীর বাড়িতে এই ভাঙচুর চালানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, তাঁরা দীর্ঘ ১০ থেকে ১২ বছর ধরে ওই এলাকায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে ফজর আলীর পরিবার এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।

মাদক কিনতে এসে যাদের আটক করা হয়েছে, তাঁরা হলেন ধুলিহর ইউনিয়নের কাশীনাথপুর গ্রামের তপন সরকার (২৭) এবং দৌলতপুর গ্রামের সাগর সরকার (২৩)। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

পুলিশ ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সদর উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন বয়সের মানুষ ফজর আলী ও আইয়ুব আলীর বাড়িতে মাদক কিনতে আসতেন। সেখানে মাদকের আড্ডাও বসত বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ দিন ধরে এলাকাবাসীর সঙ্গে তাঁদের বিরোধ চলছিল। গত শুক্রবার রাতে মাদক কিনতে আসা দুই ব্যক্তির সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজনের কথা কাটাকাটি হয়। সেই সময় স্থানীয় একজনের গলা থেকে সোনার চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর শনিবার রাতে আরও দুজন মাদক কিনতে এলে এলাকাবাসী তাঁদের ধরে ফেলেন। এই ঘটনার পর উত্তেজিত স্থানীয় লোকজন ফজর আলী ও আইয়ুব আলীর বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে এই ভাঙচুরের দৃশ্য দেখা গেছে। রাত আটটার দিকে স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান (শিমুল) ঘটনাস্থল থেকে ফেসবুকে লাইভ করেন।

মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম। খুব ভয়ংকর অবস্থা হয়েছিল। স্থানীয় লোকজন অনেক ক্ষিপ্ত হয়ে ভাঙচুর করেছে। বাড়িতে ফজর আলী ও তার ভাই আইয়ুব আলীকে দেখিনি। তবে বাড়ির নারীদের দেখেছি। তারা লোকজনকে থামানোর চেষ্টা করছিল। ঘরের ভেতরে টাকাপয়সা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পরে একজন ফজর আলীর স্ত্রীর একটি স্বর্ণের চুড়ি ফেরত দিয়ে গেছে।’

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ভালুকা চাঁদপুর মডেল হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক আবু ওয়াহিদ দাবি করেন, ফজর আলী ও আইয়ুব আলী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং সন্ধ্যার পর সেখানে মাদক কেনাবেচা চলে। তিনি আরও বলেন, আজ এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ছাত্র-জনতা, নারী-পুরুষ সবাই মিলে মাদক উচ্ছেদের জন্য এখানে এসেছেন।

মাদক কেনাবেচার বিষয়ে ফজর আলী ও আইয়ুব আলীর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ফজর আলীর স্ত্রী মমতাজ খাতুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘রাস্তায় কয়েকজনের সঙ্গে আমার স্বামীর বিরোধের জেরে লোকজন বাড়িতে এসে ভাঙচুর করেছে। মাদক বিক্রির অভিযোগ মিথ্যা।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ঘরের আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিস নষ্ট করার পাশাপাশি নগদ টাকা ও কিছু মালামাল লুটপাট করা হয়েছে।

হামলা ও ভাঙচুরের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পাশের ব্রহ্মরাজপুর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী পরিদর্শক (এসআই) হাবিবুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দুই যুবক গাঁজা কিনতে এসেছে—এমন অভিযোগে এলাকাবাসী তাঁদের আটক করে রাখেন। পরে পুলিশ তাঁদের হেফাজতে নেয়। বর্তমানে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাতক্ষীরা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শহীদুর রহমান জানিয়েছেন, আটক দুজনের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে আজ রোববার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেছে। তিনি বলেন, আটক দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁরা মামলা করতে চাইলে বা আইনি সহযোগিতার প্রয়োজন হলে পুলিশ সহযোগিতা করবে।

অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক–সুজনের সাতক্ষীরা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক আহসান রাজিব বলেন, মাদক কেনাবেচার অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে আইন হাতে তুলে নিয়ে বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, নারীদের হেনস্তা করার অধিকার কারও নেই। মাদক কেনাবেচার অভিযোগের পাশাপাশি হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।