বয়সের ভারে শরীর এখন আর আগের মতো সায় দেয় না, নেই কোনো নিয়মিত আয়ের উৎস। তবুও দমে যাননি নেত্রকোণা সদর উপজেলার শিবপ্রসাদপুর গ্রামের ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ রুস্তম আলী। চার নাতি-নাতনির মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার তাগিদে বয়সের সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে তিনি ছুটে বেড়ান মানুষের দ্বারে দ্বারে। কোনো দিন ভাগ্য সহায় হয় এবং খাবার জোটে, আবার কোনো দিন তাকে খালি হাতেই ঘরে ফিরতে হয়।

বৃদ্ধের দুশ্চিন্তার পাহাড় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তার বড় নাতির অসুস্থতা। শিশুটি মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও মৃগীসহ নানা জটিল সমস্যায় ভুগছে। কিন্তু হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় নিয়মিত চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। মা-বাবাহীন চার নাতি-নাতনির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ভেবে কথা বলতে বলতেই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন রুস্তম আলী।

তিনি নেত্রকোণা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের শিবপ্রসাদপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। এক সময় তিনি বাঁশ ও বেত দিয়ে ঝুড়ি-পায়লা তৈরি করে তা বিক্রি করে জীবন অতিবাহিত করতেন। তবে বর্তমানে বয়সের ভারে তিনি আর সেই শারীরিক সক্ষমতা পাননি, ফলে কাজ করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এক একের পর এক স্বজন হারানোর বেদনা রুস্তম আলীকে আরও নিঃস্ব ও অসহায় করে তুলেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তার ছেলে সুজন মিয়া। ২০২৪ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাবার মৃত্যুর মাত্র ১১ দিন পর তিন মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানকে রেখে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান সুজন মিয়ার স্ত্রীও। একই বছরের শেষ দিকে রুস্তম আলীর স্ত্রীও মারা যান।

এরপর চার শিশুর সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে বৃদ্ধ রুস্তম আলীর কাঁধে। তার সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ বড় নাতিকে নিয়ে। অসুস্থতার কারণে শিশুটি কখনো এক জায়গায়, আবার কখনো অন্য জায়গায় পড়ে থাকে। তাকে খুঁজে আনতে নুয়ে পড়া শরীর নিয়ে ছুটতে হয় রুস্তম আলীকে। কখনো তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, আবার কখনো সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় নাতিকে খুঁজে পান।

রুস্তম আলী জানান, এক সময় বাঁশ ও বেতের কাজ করে সংসার চালাতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছেন। এখন নিজের খাবারের নিশ্চয়তাই যেখানে নেই, সেখানে চার নাতি-নাতনির দায়িত্ব সামলানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু শিশুদের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে খাবারের ব্যবস্থা করতে বের হন।

কখনো কোনো বাড়ি থেকে চাল পান, কখনো কেউ খাবার দেন। আবার কোনো দিন খালি হাতেই ফিরতে হয়। এভাবেই অতি কষ্টে কাটছে তার দিনগুলো।

রুস্তম আলীর নাতি-নাতনিদের পড়াশোনাও এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। খাতা-কলম কেনার সামর্থ্যও অনেক সময় থাকে না। সংসারের নিত্যদিনের খাবারের জোগাড় করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে শিশুদের পড়াশোনার খরচ বহন করা তাঁর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রুস্তম আলী বলেন, “বয়স হয়েছে, কাজ করতে পারি না। নাতি-নাতনিদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। বড় নাতিটা অসুস্থ। টাকা-পয়সা না থাকায় ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারি না। কেউ সাহায্য করলে হয়তো ওর চিকিৎসা করাতে পারতাম।”

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান মিয়াসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, রুস্তম আলী নিজেই অত্যন্ত অসহায়। বয়সের কারণে তিনি আর কাজ করতে পারেন না। তার ওপর চারটি শিশুর দায়িত্ব এবং বড় নাতির অসুস্থতা—সব মিলিয়ে পরিবারটি চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে। শিশুগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। রুস্তম আলীর বয়স হয়ে গেছে, তিনি মারা গেলে এই চারটি শিশুর জীবনে আরও গভীর অন্ধকার নেমে আসবে বলে তারা আশঙ্কা করেন।

নেত্রকোণা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিজা খাতুন বলেন, “বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। অসহায় পরিবারটির প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

রুস্তম আলীর চাওয়া খুব সামান্য—নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা, নাতি-নাতনিদের পড়াশোনার সুযোগ এবং অসুস্থ নাতির সঠিক চিকিৎসা। সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষ যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তবে এই অসহায় পরিবারটির কষ্ট কিছুটা লাঘব হতে পারে।