ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্র রাফির কাছে বাংলা ভাষাটি অনেকটা বিদেশি ভাষার মতোই। বাংলা বই পড়তে গিয়ে কোনো শব্দের অর্থ বুঝতে সমস্যা হলে সে সরাসরি মায়ের শরণাপন্ন হয়। রাফির কাছে তার মা-ই হলেন প্রধান বাংলা অভিধান।
সম্প্রতি বাংলা বই পড়তে গিয়ে একটি বাক্যে রাফি আটকে গেল। বইয়ে লেখা ছিল, সূর্য পশ্চিমে অস্ত যায়। কৌতূহলী রাফি তার মাকে জিজ্ঞেস করল, “মা, অস্ত যায় মানে কী?”
মায়ের সহজ উত্তর ছিল, “অস্ত যাওয়া মানে ডুবে যাওয়া।”
মায়ের এই ব্যাখ্যা শুনেই রাফির মনে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল। সে ধরে নিল, অস্ত যাওয়া আর ডুবে যাওয়া একই কথা।
কিছুদিন পর তার বাংলা পরীক্ষায় ‘অস্ত যাওয়া’ শব্দটির মাধ্যমে বাক্য রচনা করতে বলা হলো। রাফি ভাবল, বইয়ের মুখস্থ বাক্য না লিখে যদি নিজের জীবনের বাস্তব কোনো উদাহরণ দেয়, তবে শিক্ষক হয়তো বেশি খুশি হবেন। সেই ভাবনা থেকেই সে লিখল, “দাদু সাঁতার জানেন না, তাই তিনি পুকুরে অস্ত গেছেন”।
ঘটনাটি ছিল বাস্তব। কিছুদিন আগে মাছকে খাবার দিতে গিয়ে পা পিছলে রাফির দাদু পুকুরে পড়ে গিয়েছিলেন। যেহেতু তিনি সাঁতার জানতেন না, তাই আশপাশের লোকজন দ্রুত তাকে টেনে তুলতে সক্ষম হয়।
পরীক্ষার খাতা যখন বাড়িতে এল, বাবা রাফির লেখা বাক্যটি পড়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। তবে দাদু মোটেও খুশি হলেন না। তিনি রাফির দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, “আমি পুকুরে পড়েছি, অস্ত যাইনি।”
দাদুর কথা শুনে অবাক হয়ে রাফি মায়ের দিকে তাকাল। রান্নাঘর থেকে হাসতে হাসতে মা বললেন, “ওর কথাটা ভুল না। তুমি তো ডুবেই গেছিলে।”
মায়ের কথা শুনে দাদু আর কিছু বললেন না, শুধু খবরের কাগজটি মুখের সামনে তুলে ধরে নীরবতা পালন করলেন।
তবে সমস্যাটি হলো, রাফি এই নতুন শব্দটি বেশ পছন্দ করে ফেলেছে। এখন তার কাছে ‘ডুবে যাওয়া’ মানেই হলো ‘অস্ত যাওয়া’।
বাবা যখন সারাদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন রাফি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, তুমি কি কাজে অস্ত গেছ?”
বাবার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল অবাক হওয়া, তবে পরক্ষণেই তিনি হেসে ফেললেন। রাফির এই অদ্ভুত শব্দপ্রয়োগে বাবার কাজের চাপ যেন কিছুটা হালকা হয়ে গেল।
একদিন বাড়িতে এলেন কুদ্দুস আঙ্কেল। তাকে খুব বিষণ্ণ মনে মুখ শুকনো করে বসে থাকতে দেখে রাফি ফিসফিস করে দাদুকে জিজ্ঞেস করল, “আঙ্কেল কী চাইছেন?”
দাদু উত্তর দিলেন, “আবার কিছু টাকা ধার চাইছে।”
রাফি এবার আগের মতোই ফিসফিস করে নিজের ভাষায় বলল, “বুঝেছি, কুদ্দুস আঙ্কেল লোনে অস্ত গেছে।”