প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার সাবেক ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পথেই হাঁটছে বলে দাবি করেছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম। শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকায় রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত সাইবার আইন: জবান বন্ধের নয়া বন্দোবস্ত’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন।

বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, “বিএনপিকে আমরা এখনো অভ্যুত্থানের শক্তি, আমাদের আন্দোলনের সাথী বলে মনে করতে চাই। এই আইনের মাধ্যমে বিএনপি ফ্যাসিস্ট হাসিনার পথে এগিয়ে যাবে। অভ্যুত্থানের সময় যেমন এক ছাত্রদল কর্মী বলেছিলেন, কেউ কাউরে ছাইড়া যাইয়েন না; আমরা তেমনি বিএনপিকে অনুরোধ করছি, আপনার অভ্যুত্থান ছাইড়া যাইয়েন না।”

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, বিএনপি যদি তাদের এই আহ্বান গ্রহণ না করে, তবে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ডাক দিতে বাধ্য হবে।

আইনের ধারাগুলো নিয়ে সমালোচনা করে হাসনাত কাইয়ূম বলেন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দোহাই দিয়ে ভিন্নমত দমনের যে ধারা আগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে দেখা গিয়েছিল, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তারই নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর নিপীড়নমূলক আইনি কাঠামো পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয়েছিল, এই সংশোধনী তার সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আশঙ্কা’ থেকে ‘বিশ্বাসের’ ভিত্তিতে কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা মন্ত্রণালয় ও ‘সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত যেকোনো সংস্থা’কে দেওয়া হচ্ছে। এতে আদালতের আদেশ ও প্রমাণ ছাড়াই মতপ্রকাশ মুছে ফেলা সম্ভব হবে। আবার স্পষ্ট সংজ্ঞা ছাড়া অপরাধ নির্ধারণ রাজনৈতিক স্বার্থে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে। পূর্বের আইনগুলোতেও এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগের সুযোগ ছিল। এই সংশোধনীতে তা আরও প্রকট করা হয়েছে।

গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত বক্তারা একমত হয়ে বলেন, সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন ২০২৬ নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ধ্বংস করবে এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পথ আরও প্রশস্ত করবে। অনুষ্ঠানে লেখক, গবেষক ও আইনজীবী রোকন রকি একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্টরা তাদের মতামত ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে গীতিকবি ও অ্যাক্টিভিস্ট শহীদুল্লাহ ফরায়জী তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “এটা সাইবার সুরক্ষা আইন হচ্ছে না। এটা তারা সরকার সুরক্ষা আইন বানাচ্ছেন।”

ডিএসএ ভিকটিমস নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক গোলাম মাহফুজ জোয়ার্দার বলেন, কোনো আলোচনা ছাড়াই সাইবার পুলিশ বানানো হয়েছে। সরকার নাগরিকের ওপর জুলুমের সব বন্দোবস্ত পোক্ত করছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।

গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, সরকার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিচ্ছে। এমন চলতে থাকলে দল-মতনির্বিশেষে আবারও সবার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন লাগবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবী আমাতুল্লাহ মন্তব্য করেন, জনগণের কাছে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকেন আমাদের সরকারগুলো এবং এর পরিণতি কখনো ভালো হয়নি।

সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, সরকার বারবার সংবিধানের দোহাই দেন। কিন্তু তারা নিজেরাই সংবিধান মানেন না। সংবিধান মানলে নাগরিক যা খুশি সরকারের সমালোচনা করবে, সেটা নিশ্চিত করাই সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

বৈঠকে আরও বক্তব্য প্রদান করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-এর স্থায়ী কমিটির সদস্য কে এম জাবির, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (জেডিপি)-এর আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)-এর সংগঠক বাকী বিল্লাহ, গ্রিন পার্টির মহাসচিব ইউসুফ আম্মার, অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক জালাল আহমেদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সহসভাপতি এ. জেড. নিজাম উদ্দিন ঠাকুর, ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক জহিরুল ইসলাম কাজল এবং নারী বিষয়ক সহসম্পাদিকা মনোয়ারা রহমান। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া।