জাতীয় সংসদ থেকে ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) পদত্যাগের পরদিনই জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই দুটি ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ানো যে কাউকে ছাড় না দেওয়ার কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগ, ঢাকা মহানগর উত্তরের বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া এবং ১৪ জনকে বহিষ্কারের মাধ্যমে দলের ভেতরে ও বাইরের অপরাধপ্রবণ নেতা-কর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলা পর্যায়ের নেতাদের মৌখিকভাবে সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের সাবেক ও বর্তমান বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীর নাম সামনে আসে। তাঁদের অনেকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এই ঘটনার পর ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার মুখে বিএনপি ফেরদৌসী আহমেদকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়।
অন্যদিকে, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি ও নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে বৃহস্পতিবার রাতে করা এক মামলায় শুক্রবার বিকেলে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপির সাবেক এই নেতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি দলটির সহযোগী সদস্য হিসেবে রয়েছেন, তবে কোনো সাংগঠনিক পদে নেই।
বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, নিজ দলের শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তৎপরতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সরকারবিরোধী কর্মসূচি ও বক্তব্যের ওপর নজর রাখছে সরকার। পাশাপাশি সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীদের কটাক্ষ করে বিরোধী নেতাদের দেওয়া বক্তব্যও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যেন বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সতর্ক।
বিশেষ করে প্রভাব বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ব্যক্তিগত স্বার্থে দলের নাম ব্যবহার কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বকে নিজ নিজ এলাকায় নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। কোনো নেতা বা কর্মী অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাঁকে প্রশ্রয় না দিয়ে দ্রুত কেন্দ্রকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "প্রধানমন্ত্রী অনেক আগেই সবাইকে সতর্ক করে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি সংসদ সদস্যদের বৈঠকে ও প্রতিটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বারবার সবাইকে সতর্ক করছেন। জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন। দলের নেতাদের নিজ নিজ দায়িত্বাধীন এলাকার আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন সমন্বয় ও সন্ত্রাস দমনে তৎপর হতে বলেছেন।"
উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দুটি গুরুত্বপূর্ণ সভা করেন। এর একটি ছিল জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানের আগের দিন, যেখানে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, সব যুগ্ম মহাসচিব, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকেরা উপস্থিত ছিলেন। অন্য সভাটি করা হয় বিএনপি ঘরানার টক শোর আলোচকদের নিয়ে। সূত্রটির ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী ‘গুপ্ত’ ও ‘নিষিদ্ধ’ শব্দ ব্যবহার করে দুটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টার অভিযোগ তুলে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত একজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তাঁর মনে হয়েছে যে সরকার নিজ দল এবং ‘গুপ্ত’ ও ‘নিষিদ্ধ’ বলে উল্লেখ করা দলগুলো—অর্থাৎ ঘরে-বাইরে সবার বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিয়ে এগোনোর পরিকল্পনা করছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের মতে, ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা অপরাধে জড়ালে কী পরিণতি হতে পারে, সে বিষয়ে একটি দৃষ্টান্ত তৈরির চেষ্টা।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতিগত অবস্থান হচ্ছে, বিশেষ কোনো নাম দিয়ে অভিযান না চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে আরও সক্রিয় করা। বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে কার্যকর অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, অতিপ্রচার বা হইচই না করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি ও বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির কোনো যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে কি না, তা নজরে রাখা হচ্ছে।