ক্ষমতায় আসার এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন বিএনপির সরকারের তিন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যকেও তার পদ ছাড়তে হয়েছে।

গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এর আগে পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের পদত্যাগের নেপথ্যে রয়েছে অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা। অন্যদিকে, রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় এমপি পদ ছাড়তে হয় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশে এই দুই ব্যক্তিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। অন্যদিকে, দীপেন দেওয়ান তার পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন, যদিও এই ঘটনার পেছনে দল ও সরকারের অভ্যন্তরীণ নানা মতপার্থক্যের বিষয়টি সামনে এসেছে।

সরকার সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশাসনিক তৎপরতা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে সরকারের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তার সাদামাটা জীবনযাপন, মাঠপর্যায়ে সরাসরি উপস্থিতি এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তাৎক্ষণিক নির্দেশনার মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তবে কিছু মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বিতর্কিত বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলছে।

টেলিভিশন টকশোতে বিতর্কিত মন্তব্য, অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণ, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ-বাণিজ্য এবং প্রতিষ্ঠান দখলের মতো অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন দল সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার ফলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়ে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিলেও বিতর্কের পুনরাবৃত্তি থামছে না।

মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে এবং দল ও প্রশাসনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার পর শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পাশাপাশি আগাম সতর্কতা, তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা জোরদার করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নিয়ে একটি টেলিভিশন টকশোতে মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন। তিনি বলেছিলেন, “আমি এই পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক, তা চাই না।” ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত ১৯ অক্টোবর এক বিবৃতিতে তিনি ওই মন্তব্য প্রত্যাহার করে নেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনাটিও সরকারকে বিব্রত করে। গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন তিনি। ওই সময় ইশরাক এবং তার সহযোগীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। অভিযানের ভিডিওটি তিনি নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

এই ঘটনা বিএনপি ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে অস্বস্তি তৈরি করে। সমালোচনার মুখে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে সোমবার (১৯ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ইশরাক হোসেন পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা হচ্ছে, কেউ মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থি কোনো কাজ করলে তার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তিনি যত কাছের মানুষই হন না কেন। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে তা প্রমাণ করেছেন। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।”

সংসদে সরকারি দলের সদস্যদের শৃঙ্খলা দেখভালের দায়িত্বে থাকা চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির কয়েকটি বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দলীয় প্রার্থীকে নির্বাচনে জয়ী করার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, দলীয় প্রার্থী জয়ী না হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের মানুষকে নানা সমস্যায় পড়তে হবে এবং ওই এলাকায় কোনো কাজ দেওয়া হবে না। তার এই বক্তব্য দেশজুড়ে সমালোচিত হয়।

অন্য এক বক্তব্যে তিনি বলেন, “মায়েদের দুইটা সন্তানসহ তালাক দিবা, সেই সুযোগ আর নাই। তালাক বন্ধ করেছে এই ফ্যামিলি কার্ড।” এছাড়া আগামী বছর দেশে বিদ্যুৎ রাখার জায়গা থাকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধীরা তার এসব বক্তব্যকে ট্রলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এর আগে আন্দোলনরত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের “ফার্মের মুরগির বাচ্চা” বলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এছাড়া সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রীর একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সারের নতুন ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নানের ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী নতুন ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। পাশাপাশি নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।

গত শুক্রবার নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর স্থানীয় বিএনপির একাংশের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তাদের অভিযোগ, ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে সংসদ সদস্যের স্বজনদের ডিলার করা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাজিদুর রহমান ডিলার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গুনিয়াউক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে এ নিয়োগের সমালোচনা করেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য এম এ হান্নান। তার দাবি, সরকারি আইন ও নিয়ম মেনে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তিন ইউনিয়নে যোগ্য প্রার্থী আবেদন না করায় তার ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভাগিনার স্ত্রী নিয়োগ পেয়েছেন। আর অর্থ লেনদেনের অভিযোগকে তিনি সম্পূর্ণ গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর তা গৃহীত হয়।

পদত্যাগপত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে দীপেন দেওয়ান জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন তিনি। এই কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজ পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। তবে তার পদত্যাগের পেছনে শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন, চেয়ারম্যান পদে সুপারিশ নিয়ে মতপার্থক্য এবং রাঙামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় আলোচনায় এসেছে।

পরবর্তীতে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার ও দীপেন দেওয়ানকে পুনর্বহালের দাবিতে রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ করেন তার অনুসারীরা। তাদের দাবি ছিল, দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।

এরপর গত ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন জহির উদ্দিন স্বপন। ওই দিনই তাকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগের দিন তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান আন্দালিভ রহমান পার্থ। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে যে, জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রিত্ব কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

মিরপুরের দরিদ্র মা ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতিসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্র। ১৯৭৪ সাল থেকে এই সেবা চলছে। মিরপুরের ১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রায় ২০০ ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। এছাড়া পাকা ভবনের আলট্রাসাউন্ড কক্ষ, টিকা কক্ষ ও পরীক্ষাগারসহ পাঁচটি কক্ষের দরজা-জানালা ভাঙচুর করা হয়।

এই ঘটনায় আলোচনায় আসেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গত ১ অক্টোবর পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে সংসদ সচিবালয় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর অবস্থান আগামী দিনগুলোতেও বজায় থাকবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ফ্যাসিবাদী আমলের লুটপাট, অরাজকতা ও অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি কোনো অবস্থাতেই মেনে নেওয়া হবে না। সাধারণ ভোটার ও জনগণের কাছে প্রমাণ করতে হবে, বিএনপির নেতাকর্মীরা সহনশীল ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী।”

তিনি আরও বলেন, “এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে সাধারণ মানুষ নিজেদের অনিরাপদ মনে করেন। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপকর্মে লিপ্ত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ৫ আগস্টের পর থেকে দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম ও বিশৃঙ্খলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতিমধ্যেই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন।”

রিজভী বলেন, নেতাকর্মীদের দলের ব্যানার ব্যবহার করে সব ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে হবে। দলের ভাবমূর্তি বাড়াতে গঠনমূলক কাজে মনোনিবেশ করতে হবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ইশরাক ও মিষ্টির পদত্যাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নিঃসন্দেহে একটি বড় বার্তা দিয়েছেন। অন্তত আইন যে সবার জন্য সমান, তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। আইনবহির্ভূত কোনো কাজ মেনে নেওয়া হবে না। আইন নিজের হাতে তুলে নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এটি সরকারপ্রধানের ইতিবাচক পদক্ষেপ।”

তিনি আরও বলেন, ক্ষমতা পেলেই কেউ আইন ভাঙবেন, আর তা করে পার পেয়ে গেলে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ অন্য নেতাকর্মীদের জন্যও কঠিন সতর্কবার্তা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর বার্তা পরিষ্কার। সরকারে থাকলে শৃঙ্খলা আরও বেশি মেনে চলতে হয়। বিচারের ক্ষেত্রে বৈষম্য যাতে তৈরি না হয়, সেই বিবেচনা থেকেই প্রধানমন্ত্রী পদক্ষেপ নিচ্ছেন।”

তিনি বলেন, “ইশরাকও প্রধানমন্ত্রীর কথায় পদত্যাগ করেছেন। এটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি এ ধরনের পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করবে এবং নেতাকর্মীরা এখান থেকে শিক্ষা নেবেন।”