নড়াইলের কালিয়া উপজেলার ফুলবদিনা গ্রামের প্রবাসফেরত উদ্যোক্তা হুমায়ুন কবির। বিদেশের কর্মজীবন ত্যাগ করে দেশে ফিরে তিনি নতুন স্বপ্ন বুনছেন। শুরুতে গড়ে তোলেন গরুর ডেইরি ফার্ম, তবে পরে গোবরকে সম্পদে রূপ দিতে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদনে মনোযোগী হন। প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুললেও দক্ষ কর্মী সংকট, বাজারজাতকরণের চ্যালেঞ্জ এবং কৃষকদের মধ্যে পরিচিতি না থাকায় উদ্যোক্তাটি এখন দুশ্চিন্তায় আছেন।
কেঁচোকে প্রকৃতির লাঙল বলা হয়। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এর ভূমিকা অপরিসীম। গোবর পচিয়ে কেঁচোর মাধ্যমে যে জৈব সার তৈরি হয়, তা পরিবেশবান্ধব। রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ সাশ্রয় করার ক্ষেত্রে এ সারের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে তিন বছর আগে হুমায়ুন কবির ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন। বন্ধুদের পরামর্শে গরুর গোবর দিয়ে কেঁচো সার তৈরির এই যাত্রায় শুরুতে ভালো লাভ হলেও ধীরে ধীরে উৎপাদনের পরিসর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বর্তমানে তার খামারে ৪৮টি সার উৎপাদনের হাউজ রয়েছে। প্রতিটি হাউজে প্রায় ৫০০ কেজি সার উৎপাদনের সক্ষমতা থাকায় মোট প্রায় ২৪ হাজার কেজি সার উৎপাদন ও বাজারজাত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন উদ্যোক্তা।
হুমায়ুন কবির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "হাউজ নির্মাণ, ঘর তৈরি এবং সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কেঁচো সংগ্রহসহ পুরো প্রকল্পে তার প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এত বড় বিনিয়োগের পরও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষ কর্মী পাওয়া এবং উৎপাদিত সার কৃষকদের কাছে পরিচিত করে তোলা।"
তিনি আরও জানান, প্রবাস থেকে ফিরে নিজ এলাকায় কিছু করার উদ্দেশ্যে প্রথমে ডেইরি ফার্ম শুরু করলেও বন্ধুদের পরামর্শে কেঁচো সার উৎপাদনে আসেন। প্রথম দিকে ভালো সাড়া পেলেও এখন দক্ষ লোকের অভাব এবং কৃষকদের কাছে সারটি পরিচিত না করতে পারার বিষয়টি চিন্তার কারণ। কৃষি অফিসের সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ আরও বড় করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
উৎপাদিত সার যথাযথভাবে বাজারজাত না হলে বড় ধরনের লোকসানের ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবির বলেন, "কৃষকদের মধ্যে এ সারের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়াতে কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং সার বিক্রির ডিলারদের সহযোগিতা প্রয়োজন। তা না হলে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।"
এ বিষয়ে কালিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "ভার্মি কম্পোস্ট সার মাটির উর্বরতা ঠিক রাখতে সহায়তা করে। এটি পরিবেশবান্ধব জৈব সার। এ ধরনের সার উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের আগ্রহী হওয়া ইতিবাচক বিষয়। সরকারি পর্যায় থেকে সহযোগিতার সুযোগ থাকলে অবশ্যই তাদের সহায়তা করা হবে।"
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সার বিক্রির ডিলারদের মাধ্যমে ভার্মি কম্পোস্টের পরিচিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে কৃষকেরা এ সার সম্পর্কে জানতে পারেন এবং ব্যবহারে আগ্রহী হন।
প্রবাসের জীবন শেষে নিজ এলাকায় ফিরে হুমায়ুন কবিরের এই উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বপ্ন নয়, বরং পরিবেশবান্ধব কৃষি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা, দক্ষ জনবল ও বাজারজাতকরণের সুযোগ পেলে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে। গোবর থেকে জৈব সার উৎপাদনের মাধ্যমে নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে চান এই উদ্যোক্তা।