পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে অন্তত ৭০ জন সংবাদকর্মী শারীরিক হামলা, গ্রেপ্তার, আইনি হয়রানি, হুমকি ও বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টসের (বিএজে) সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। শুক্রবার বিএজের গবেষণা ও মনিটরিং সেলের সম্পাদক মাহমুদুল হাছানের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, আক্রান্ত সংবাদকর্মীদের মধ্যে ৪০ জন শারীরিক হামলা ও আঘাতের শিকার হয়েছেন। আটজন আইনি হয়রানির মুখে পড়েছেন এবং ২২ জন সরাসরি হুমকি, হেনস্তা ও পেশাগত কাজে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।
সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার বেশ কিছু ঘটনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কক্সবাজারে এক সাংবাদিকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাং। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গ্যাংয়ের সদস্যরা কিরিচ ও হাতুড়ি নিয়ে হামলা চালায়। এতে ওই সাংবাদিকের মা হাতুড়ির আঘাতে এবং ছোট ভাই ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন।
চাঁদপুরের কচুয়ায় এক যুবকের বিরুদ্ধে তাঁর ভাতিজিকে ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিকের ওপর হামলা চালানো হয়। পথরোধ করে তাঁকে মারধরের পাশাপাশি সঙ্গে থাকা শিশুকন্যাকেও মারধর করা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
রাজধানীর পল্লবীতে ‘আশিক গ্রুপের’ চাঁদাবাজি নিয়ে সংবাদ প্রচারের জেরে সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজের বাসায় হামলার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাত দুইটার দিকে মোটরসাইকেলে করে এসে সন্ত্রাসীরা তাঁর বাসায় হামলা ও গুলিবর্ষণ করে। এছাড়া মিরপুরে অবৈধ হকার উচ্ছেদ অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অন্তত ছয়জন সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন। উচ্ছৃঙ্খল হকাররা তাঁদের ঘেরাও ও ধাওয়া করে, মারধর করে এবং ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় একটি টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগও করা হয়েছে।
আইনি হয়রানির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নওগাঁয় জমির দখল নিয়ে সংঘর্ষে নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলায় এক সাংবাদিককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি করা হয়েছে। মামলার বাদী প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তিনি ওই সাংবাদিককে চেনেন না এবং এজাহারে তাঁর নাম কীভাবে এসেছে, তা-ও জানেন না। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের অভিযোগ, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আগে সংবাদ প্রকাশ করায় তাঁর ওপর আক্রোশ থেকে চেয়ারম্যানের প্রভাব খাটিয়ে তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
বরগুনায় চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার এক সাংবাদিকের ডোপ টেস্ট করানোর বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁর পরিবারের দাবি, মামলাটি ষড়যন্ত্রমূলক। বিএজে জানিয়েছে, মামলার এজাহারে তাঁর বিরুদ্ধে মাদক সেবন, বহন বা মাদকসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ ছিল না এবং ডোপ টেস্টেও মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ওই সাংবাদিককে দুই হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে আদালতে তোলা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে পৌরসভার উন্নয়নকাজ ও আর্থিক হিসাবের তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করায় এক সাংবাদিককে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফোন করে অসৌজন্যমূলক ভাষায় কথা বলেন এবং ‘অফেন্সিভ মোডে’ যাওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর এই হামলা, পেশাগত কাজে বাধা ও আইনি হয়রানির জন্য আইনের শাসনের ঘাটতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করেছে বিএজে। সংগঠনটির মতে, এসব ঘটনা মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য হুমকি। রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব কিংবা পেশিশক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিএজে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।