৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য পিএসসি ৬৬৮ জনকে সাময়িকভাবে মনোনয়ন দিয়েছিল। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে শুধুমাত্র ৬১১ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত ৫৭ জন প্রার্থী নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কেন তাদের নাম প্রজ্ঞাপনে নেই, তা সংশ্লিষ্ট তথ্যে স্পষ্ট করা হয়নি।

এই ঘটনা দেশের চাকরি খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি বিতর্কের পুনরাবৃত্তি করছে। বিগত সরকারের সময়ও অনেক প্রার্থী পুলিশ ভেরিফিকেশন বা অন্যান্য কারণে নিয়োগবঞ্চিত হয়েছিলেন। এই বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া কাউকে আটকে দেওয়া ঠিক নয়" এবং নেতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদনের কারণে নিয়োগ আটকে রাখার প্রক্রিয়াকে অন্যায় ও অনৈতিক বলে অভিহিত করেছিলেন।

একজন তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে বিসিএসের প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার কঠোর পথ পাড়ি দিয়ে পিএসসির মনোনয়ন লাভ করেন, তখন তার স্বপ্ন ও পরিবারের আশা জেগে ওঠে। কিন্তু নিয়োগপ্রজ্ঞাপনে তার নাম না থাকলে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একজন মানুষের কয়েক বছরের শ্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারে জবাবদিহিতা থাকা জরুরি।

৪৯তম বিসিএসের এই ৫৭ জনের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আছে কি না, যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদি সরকারের কাছে বৈধ কারণ থাকে, তবে তা সংশ্লিষ্টদের জানানো উচিত। আর যদি যাচাই চলমান থাকে, তবে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বিসিএস সুপারিশ পেয়েও নিয়োগবঞ্চিত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। অতীতে আদালত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে প্রার্থীর নিজের কর্মকাণ্ড ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রার্থীর নিজের অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়। সরকারি চাকরির যোগ্যতা নির্ধারিত হওয়া উচিত মেধা, যোগ্যতা, সততা ও আইনসম্মত মানদণ্ডের ভিত্তিতে।

অতীতে নিয়োগবঞ্চিত অনেক প্রার্থীকে সরকার পরিবর্তনের পর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা পুরোনো ভুলগুলো সংশোধনের ইঙ্গিত দেয়। ন্যায়বিচারের মানদণ্ড সরকারভেদে বদলাতে পারে না। ক্ষমতার পালাবদল হলেও, একজন নাগরিকের আইনসম্মত ও বৈষম্যহীন বিবেচনা পাওয়ার অধিকার অপরিবর্তিত থাকে।

নিয়োগবঞ্চনার প্রভাব শুধু প্রার্থীর ওপর নয়, তার পরিবারের ওপরও পড়ে। দীর্ঘ অপেক্ষা আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে। পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পর পরিবার ও আত্মীয়স্বজন ধরে নেন চাকরি হয়ে গেছে। কিন্তু মাস বা বছরের পর বছর যোগ দিতে না পারলে তারা বারবার প্রশ্ন করেন, ‘চাকরিটা তাহলে হলো না কেন?’ অনেক সময় প্রার্থীর নিজের কাছেও এর উত্তর থাকে না। এতে তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার ক্ষতি হয়।

আলী ইমাম মজুমদার লিখেছিলেন, দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যোগ্য প্রার্থীদের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। আজ সেই কথাগুলো আবার মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে। ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের ৫৭ জনকে শেষ পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হবে কি না, তার আগে একটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি—পিএসসির মনোনয়ন পাওয়ার পরও তাঁদের নাম প্রজ্ঞাপনে নেই কেন?

রাষ্ট্র বদলানোর অর্থ শুধু ক্ষমতার মানুষ বদলানো নয়; রাষ্ট্র বদলানোর অর্থ হওয়া উচিত অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত পুরোনো চর্চাগুলোও বদলানো।

*লেখক: মোছাব্বের হোসেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানায় পরিবেশবিজ্ঞান ও ন্যাচারাল রিসোর্স জার্নালিজমে অধ্যয়নরত