দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি হতে পারবেন না সংসদ সদস্যরা (এমপি)। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের (রিট পিটিশন নম্বর ২৩০/২০১৭) স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে এই পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত নথিপত্র ‘মুক্তকণ্ঠ’-এর হাতে সংরক্ষিত আছে।
২০২০ সালের আগস্টে হাইকোর্টের এই রায়ের প্রেক্ষিতে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষদের বিষয়টি জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। তবে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলোর প্রস্তাবে এমপিদের নাম অনুমোদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ উঠেছে, দৃষ্টি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামের পাশে ‘এমপি’ বা ‘সংসদ সদস্য’ পদবিটি কৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে বগুড়ার গাবতলীতে তরফ সরতাজ কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি হিসেবে মনোনীত হন স্থানীয় সংসদ সদস্য মোরশেদ মিলটন (বগুড়া-৭, গাবতলী-শাহজাহানপুর)। এই মনোনয়নে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও বর্তমান উপ-রেজিস্ট্রার ফাহাদ আহমদ মোমতাজি। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জহুরুল ইসলাম ‘মুক্তকণ্ঠ’-কে বলেন, “মোরশেদ মিলটনকে প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।” তবে তিনি মোরশেদ মিলটন সংসদ সদস্য কি না, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি দাবি করেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) বিধি-বিধান মেনেই আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন।
তবে বগুড়া জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সালমা আক্তার ‘মুক্তকণ্ঠ’-কে জানান, তাঁর মাধ্যমে এই প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি। বরং এমপি নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এই বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, তৎকালীন রেজিস্ট্রার ফাহাদ আহমদ মোমতাজি জানান, আদালতের রায়ে এমপিদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ নেই, তবে বিষয়টি কীভাবে অনুমোদন হলো তা ফাইল দেখে বলতে হবে।
একইভাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় ভবানীপুর ছেফাতিয়া কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে মনোনীত হন স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসান রাজিব প্রধান (লালমনিরহাট-১)। এই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. মনজুরুল ইসলাম জানান, এমপি নিজেই সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং তাঁর সুপারিশ ছাড়া প্রস্তাব পাঠানোর সুযোগ নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কীভাবে এটি অনুমোদন করল, তা তাঁদের জানা নেই। এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন বর্তমান রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক এ কে মুহা. নুরুল ইসলাম। তিনি জানান, বিধি-বিধান না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব হবে না।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে আদালতের রায়ে এমপিদের পথ বন্ধ হলে জেলা সদরের মাদ্রাসায় জেলা প্রশাসক এবং সদরের বাইরের মাদ্রাসায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হতো। পরবর্তীতে এমপিদের মনোনীত প্রতিনিধিরা এই দায়িত্ব পেলেও পরে তা বাতিল করে পুনরায় জেলা প্রশাসনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে সম্প্রতি আবারও এমপিদের সুপারিশে সভাপতির পথ উন্মুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের সভাপতি অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী ‘মুক্তকণ্ঠ’-কে বলেন, “অরাজনৈতিক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের মাদ্রাসাসহ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি করা হলে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বৃত্তায়নের পথ বন্ধ করা সম্ভব হবে।”
হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এমপিদের সভাপতি করার বিষয়ে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর খান ‘মুক্তকণ্ঠ’-কে বলেন, “সভাপতি হতে অনেক এমপি-মন্ত্রীর ডিও লেটার এসেছিল, যেগুলো আমলে নিইনি। কিন্তু গভর্নিং বডির সভাপতির প্রস্তাবে থাকা ব্যক্তি এমপি নাকি মন্ত্রী, তা তো সবসময় আবেদনে লেখা থাকে না। তাই অসতর্কতাবশত এমপিরা সভাপতি হয়ে থাকতে পারেন।”
তিনি জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের দলীয়করণ তিনি পছন্দ করেন না।