পদ্মার বুক চিরে অবস্থিত মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়ন। নদী ও মাছকে কেন্দ্র করে গড়া এই এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা পদ্মার ওপর নির্ভরশীল। নদীতে মাছ থাকলে সংসার চালানো সম্ভব, কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় উপার্জন থমকে যায়। এমন সংকটকালে সরকারি সহায়তা পরিবারগুলোর একমাত্র ভরসা হওয়া উচিত। তবে চরাঞ্চলে ‘জেলে কার্ড’ প্রদান ও তালিকা তৈরিতে উঠেছে চরম অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ।

স্থানীয় জেলেদের দাবি, বছরের পর বছর পদ্মায় জাল ফেলে সংসার চালানো বহু প্রকৃত জেলে তালিকায় ঠাঁই পাননি। অথচ পেশায় জেলে নন, এমন অযোগ্য ব্যক্তিদের নামে সরকারি কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। এমনকি সরকারি খাতায় একজন জীবিত জেলেকে ‘মৃত’ দেখিয়ে তার নিয়মিত সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে।

১৮ বছর ধরে পদ্মায় মাছ ধরে সংসার চালাচ্ছেন চরজানাজাতের লোকমান সরকার। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তার বিকল্প কোনো আয়ের সুযোগ নেই। এত বছর পেশাদার জেলে হিসেবে কাজ করা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত তার ভাগ্যে জোটেনি একটি জেলে কার্ড। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সুবিধার বাইরে থাকা লোকমান প্রশ্ন তোলেন, যারা নদীতে নেমে পরিবার চালায় তারা যদি তালিকায় জায়গা না পায়, তবে এই কার্ড আসলে কাদের জন্য?

একই চিত্র আরেক জেলে রাকিবের ক্ষেত্রেও। বংশানুক্রমিক জেলে পরিবারটিতে বাবা হালান ফকিরের মৃত্যুর পর পেশার হাল ধরেছেন তিনি। চরাঞ্চলে তারা জেলে পরিবার হিসেবে পরিচিত হলেও মেলেনি কার্ড। অন্যদিকে, চার-পাঁচবার জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি জমা দিয়েও কার্ড পাননি স্থানীয় রহিম মাদবর। প্রতিবারই আশ্বাস পেলেও শেষ পর্যন্ত ঝুলিতে এসেছে হতাশা। রহিমের মতো চরাঞ্চলের অসংখ্য প্রকৃত জেলে দফায় দফায় কাগজপত্র জমা দিয়েও কার্ড পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তালিকা তৈরির অনিয়মের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগটি এসেছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলের কাছ থেকে। দুই বছর আগে হঠাৎ তার সরকারি সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। কারণ খুঁজতে সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, নথিপত্রে তাকে ‘মৃত’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অথচ তিনি এখনো সশরীরে জীবিত থেকে নদীতে নিয়মিত মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ঘটনাটি জানার পর ওই জেলে বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, কীভাবে সরকারি নথিতে তার মতো একজন জীবিত মানুষকে মৃত হিসেবে দেখানো হলো, কিংবা কার মাধ্যমে তার তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে তা তিনি জানেন না।

মাঠপর্যায়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কীভাবে একজন জীবিত মানুষ নথিভুক্ত ‘মৃত’ হয়ে গেলেন, তা নিয়ে চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। পদ্মায় মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকলে উপার্জন পুরোপুরি বন্ধ থাকে জেলেদের। সরকারি সহায়তা না পেলে ধারদেনা করেই দিন পার করতে হয় তাদের। চরজানাজাত এলাকার বাসিন্দা হুমায়ুন সরকার, আলামিন ফকির, রেদোয়ান সরকার ও রুবেল মাতব্বরসহ স্থানীয়রা জানান, অফিসে বসে কাগজ দেখে নয়, বরং কার নৌকা-জাল আছে এবং কে প্রকৃতপক্ষে নদীকেন্দ্রিক জীবিকায় জড়িত, মাঠে গিয়ে সরেজমিন তদন্ত করে তালিকা হালনাগাদ করা জরুরি।

চরজানাজাত ইউনিয়নের সমাজসেবক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন বেপারী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পদ্মায় রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন, সরকারি সহায়তার প্রকৃত হকদার তারাই। অসচ্ছল ও প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে করা এ তালিকা দ্রুত পুনর্যাচাই এবং অযোগ্যদের বাদ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার মুক্তকণ্ঠকে জানান, ভুয়া ও অযোগ্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কাজ চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে অনুপযুক্তদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে এবং বাদ পড়া প্রকৃত জেলেদের নতুন করে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অ-জেলেরা সুবিধা নিচ্ছেন, এমন অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।