ঢাকার ধানমন্ডি ১৫ নম্বর এলাকার ফুটপাতের ফলের দোকানে গতকাল রোববার দুপুরে ফল কিনতে গিয়েছিলেন মো. জাহাঙ্গীর। তিনি কিনবেন মাল্টা। কারণ, তাঁর এক স্বজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।
জাহাঙ্গীরের কাছে ফল বিক্রেতা মো. বাদশাহ মাল্টার কেজি চাইছিলেন ৪৫০ টাকা। দর এক টাকাও কমানো যাবে না, তা-ও বলে দিচ্ছিলেন তিনি।
জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ফলের দাম অস্বাভাবিক রকম বেশি। আমাদের মতো মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে।’
বাজার থেকে একটু বড় আকারের পাঁচটি মাল্টা কিনে দেখা গেল, এক কেজির একটু বেশি হয়েছে। এতে একেকটি মাল্টার দাম পড়েছে ১০০ টাকা।
বাজারে ফলের দাম কতটা চড়া, তার একটি উদাহরণ মাল্টা। আমদানি করা এই ফল ২০২২ সালের আগে ঢাকার বাজারে ১৫০ টাকা কেজির আশপাশে বিক্রি হতো বলে জানিয়েছেন ফল ব্যবসায়ীরা। ২০২২ সালে ডলার-সংকটে পড়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণের জন্য ফলের ওপর বাড়তি কর বসানো হয়। ডলারের দামও বাড়ে। সব মিলিয়ে আমদানি করা ফল সাধারণ মানুষের নাগালছাড়া হয়। দেশীয় ফলের দামও কম নয়।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক কেজি কমলা বিক্রি হচ্ছে ৪৫০-৪৮০ টাকা। ডালিম ও বেদানার দাম আরও চড়া। আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকা। আপেলের কেজি ৩৮০ থেকে ৫২০ টাকা। আঙুরের কেজি ৪৮০ থেকে ৫৫০ টাকা।
বাজারে দেশীয় কিছু কিছু ফল আছে। যেমন পাকা পেঁপে, পেয়ারা, জাম্বুরা, আমড়া, সবুজ মাল্টা ইত্যাদি। সেগুলোর দামও কম নয়। ভালো মানের পাকা পেঁপের কেজি ১২০ টাকার মতো। মাঝারি আকারের একটি পেঁপে কিনতে লাগে ১৫০ টাকার বেশি।
পাঁচজনের একটি পরিবারে একটি পেঁপে কাটলে একবারেই শেষ হয়ে যায়। ফলে দেশীয় ফলেও খরচ কম নয়।
বাজার থেকে একটু বড় আকারের পাঁচটি মাল্টা কিনে দেখা গেল, এক কেজির একটু বেশি হয়েছে। এতে একেকটি মাল্টার দাম পড়েছে ১০০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে ফলের অত্যধিক উচ্চ মূল্যের কারণ চাহিদা বেড়ে যাওয়া। চাহিদা বৃদ্ধির কারণ ডেঙ্গু। চিকিৎসকেরা ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মাল্টা, কমলাসহ বিভিন্ন ফলের রস খেতে উৎসাহিত করেন।
দেশে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬১ হাজার ৯৭২ জন।
ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক রোবেদ আমিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ডেঙ্গুর প্রথম দিকে জ্বরের জন্য অনেক বেশি ঘাম হয়। ফলে শরীর থেকে অনেক ফ্লুইড (তরল) ও লবণ চলে যায়। সে জন্য রোগীদের ওরস্যালাইন, জুস, ডাবের পানি, স্যুপ ইত্যাদি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, যেখানে কিছু লবণ থাকে।
ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যে ব্যাপকভাবে বেড়েছে ডাবের দাম। ঢাকার ফুটপাত ও বাজারে প্রতিটি ডাব বিক্রি হতে দেখা গেল আকারভেদে ১৫০, ১৮০ ও ২২০ টাকায়।
সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির বাইরে আগে থেকেই ফলের দাম বেশি। তার কারণ উচ্চ শুল্ক ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি।
ডেঙ্গুর প্রথম দিকে জ্বরের জন্য অনেক বেশি ঘাম হয়। ফলে শরীর থেকে অনেক ফ্লুইড (তরল) ও লবণ চলে যায়। সে জন্য রোগীদের ওরস্যালাইন, জুস, ডাবের পানি, স্যুপ ইত্যাদি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, যেখানে কিছু লবণ থাকে।
ফল আমদানির ওপর এখন মোট শুল্ক-কর ১২২ শতাংশ। মানে হলো, ১০০ টাকার ফল আমদানির জন্য ১২২ টাকা শুল্ক-কর দিতে হয়। অন্যদিকে ২০২২ সালে ডলার ছিল ৮৬ টাকা। এখন তা ১২৩ টাকা।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মুক্তকণ্ঠকে বলছিলেন, ডলার-সংকটের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণের যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তার প্রয়োজন তিনি গভর্নর থাকার সময়ই ফুরিয়েছে। ফলে আমদানি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবে শুল্ক-কর কমানোর বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হাতে।
ফল আমদানিতে ১২২ শতাংশ শুল্ক-করভার গ্রহণযোগ্য কি না জানতে চাইল আহসান মনসুর বলেন, মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এত বেশি শুল্ক-কর আরোপ করে রাখা হয়েছে রাজস্বের জন্য। উচ্চ শুল্ক-কর আরোপ করা হলে রাজস্বও বাড়ে, তা-ও ঠিক নয়; বরং তাতে অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারী করার সুযোগ তৈরি হয়।
আহসান মনসুর জানান, তিনি আপেল ও নাশপাতি ছাড়া অন্য কোনো ফল খেতে পারেন না। অন্য ফল খেতে চিকিৎসক নিষেধ করেছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিদেশ থেকে ৩৮ ধরনের ফল আমদানি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ফল আমদানির ঋণপত্রে (এলসি) শতভাগ টাকা জমা দেওয়ার (মার্জিন) নিয়ম তুলে নেওয়া হয়েছে গত মাসে।
এনবিআরের হিসাব বলছে, গত জুলাইয়ে দেশে ২৩ হাজার ৭১৭ টন মাল্টা, আপেল, কমলা ও আঙুর আমদানি হয়েছে। আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ৪১ হাজার ১৮৬ টন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৯ দিনে আমদানি হয়েছে ২৩ হাজার ৫৩৬ টন ফল।দেখা যাচ্ছে, আমদানি কম নয়। তবে দাম চড়া।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১০ অনুযায়ী, ওই সময় দেশে মাথাপিছু ফল গ্রহণ ছিল গড়ে ৪৫ গ্রাম। ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, সেটা ৩৬ গ্রামে নামে। ২০২২ সালের জরিপ বলছে, ফল খাওয়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ৪ গ্রামে।
যদিও বিবিএসের এই জরিপ নিয়ে প্রশ্ন আছে। অন্যদিকে ২০২২ সালের পর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফল খাওয়া কমেছে কি না, সে হিসাব নেই।
অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, ধনী-গরিব সবার, সব শিশুর পুষ্টির জন্য ফল খাওয়া দরকার। ফলের দাম কমাতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।