রাজধানীর ফল আমদানির প্রধান কেন্দ্র পুরান ঢাকার বাবুবাজার-বাদামতলী পাইকারি বাজারে গত শনি ও রোববার দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা মাল্টার কেজি বিক্রি হয়েছে ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায়। তবে এই একই মাল্টা যখন খুচরা বাজারে পৌঁছায়, তখন তার দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। ঢাকার হাতিরপুল, গুলশান, মহাখালী ও কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সেখানে একই মাল্টা ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ পাইকারি দামের তুলনায় খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ১৩৫ থেকে ১৬০ টাকা বেশি রাখা হয়েছে।

কেবল মাল্টাই নয়, বিদেশ থেকে আসা কমলা, আপেল, আঙুর ও আনার—এই মোট পাঁচ ধরনের ফলের পাইকারি ও খুচরা বাজারদরের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরা বাজারে এই ফলগুলোর দাম গড়ে ৪৮ শতাংশ বেশি।

ফলের এই উচ্চমূল্যের বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) গত ২৭ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের তুলনায় বাংলাদেশে ফল আমদানির ওপর শুল্ক-করের হার অনেক বেশি, যা প্রায় ১২২ শতাংশ। ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচনা করে এই উচ্চহারে শুল্ক-কর আরোপ করা হয়েছে। কমিশনের ওই প্রতিবেদনে পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দেখা যায় এক কেজি মাল্টার পাইকারি দর ২৭৫ টাকা হলে খুচরা বাজারে তা ৩৭০-৪০০ টাকায় বিক্রি হয়।

আমদানিতে উচ্চ শুল্ক-কর এবং বাজারে সরবরাহ ও প্রতিযোগিতার অভাবের কারণে ফল এখন স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অথচ পুষ্টির জন্য নিয়মিত ফল খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। বাজারে দেশীয় ফলের উপস্থিতি থাকলেও তা মোট চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে শিশুরা আপেল, মাল্টা ও কমলার মতো ফল বেশি পছন্দ করে এবং প্রবীণদের অনেকে শারীরিক সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট কিছু ফল ছাড়া অন্য কিছু খেতে পারেন না। এছাড়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বছরের একটি বড় সময় ধরে মাল্টা ও কমলাজাতীয় ফলের ব্যাপক চাহিদা থাকে, যার বিকল্প হিসেবে কোনো দেশীয় ফল পাওয়া যায় না।

উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর মুক্তকণ্ঠতে ‘ এখন একটি মাল্টা ১০০ টাকা, একটি ডাব ১৫০-২২০ ’ শিরোনামে ফলের দাম নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ফল ব্যবসায়ীদের সাথে একাধিক বৈঠক করেছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফলের দাম কমাতে সরকার শুল্ক-কর কমানোর কথা বিবেচনা করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু শুল্ক-কর কমালেই হবে না, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে এবং কর কমানোর প্রকৃত সুফল যেন সাধারণ মানুষ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আপেল, মাল্টা, আঙুর, কমলা ও আনার—এই পাঁচ ফলের পাইকারি গড় দাম কেজি প্রতি ২৯৮ টাকা, যেখানে খুচরা বাজারে গড় দাম ৪৪১ টাকা। অর্থাৎ পাইকারি দামের তুলনায় খুচরা বাজারে এসব ফলের দাম গড়ে ৪৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।

গত রোববার বাদামতলী পাইকারি বাজারে দেখা যায়, ঢাকার অনেক খুচরা বিক্রেতা ফল কিনতে সেখানে ভিড় করেছেন। এখান থেকেই বিভিন্ন জেলায় ফল সরবরাহ করা হয়। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, আড়ত থেকে ফল কেনার পর তারা পাঁচটি ভিন্ন খাতে ব্যয় যোগ করে দাম নির্ধারণ করেন। তাদের অভিযোগ, ২০ কেজির কার্টনে ফল কিনলেও অনেক সময় ওজনে কম থাকে। এছাড়া প্রতি কার্টনে ২০ টাকা কমিশন, পরিবহন খরচ, দোকানভাড়া এবং ফুটপাতের দোকানের ক্ষেত্রে চাঁদা দিতে হয়।

হাতিরপুলে খুচরা ফল বিক্রেতা আজগর হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অনেক সময় ফল পচে নষ্ট হয়ে যায়, সেগুলো ফেলে দিতে হয়। আবার পাইকারি বাজার থেকে ২০ কেজি বা ১০ কেজির কার্টুন হিসেবে ফল কিনে আনি। কিন্তু দেখা যায় এসব কার্টনে ওই পরিমাণ ফল থাকে না। সব সময় দুই এক কেজি কম থাকেই। সব মিলিয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম একটু বেশি হয়।”

রাজধানীর মোড়ে মোড়ে এবং ভ্রাম্যমাণ দোকানে ফলের ব্যবসার ব্যাপকতা দেখে বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক। বিক্রেতাদের সংখ্যা অনেক হলেও দাম কমানোর প্রবণতা কম। অনেক দর-কষাকষির পর বড়জোর ১০ টাকা কমানো যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট বাজারের ব্যবসায়ীরা সবাই একই দাম নির্ধারণ করেন এবং কেউ দাম কমিয়ে বিক্রি করলে অন্যরা তার ওপর চড়াও হন।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর যদি দৃশ্যমান স্থানে প্রতিদিনের পাইকারি দরের তালিকা টাঙিয়ে দেয়, তবে খুচরা বিক্রেতাদের অতি মুনাফার বিষয়টি সামনে আসবে। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য নাজিম উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, খুচরা বিক্রেতারা অল্প পণ্যে বেশি লাভের চেষ্টা করেন। সে ক্ষেত্রে কেজিতে তাঁদের ৮০ থেকে ১০০ টাকা লাভ করতে হয়। তিনি আরও বলেন, “জনগণের পাইকারি ও খুচরা বাজারের তথ্য জানা না থাকা, এটিও একটি সংকট। যদি একটি নজরদারির ব্যবস্থা চালু করা যায়, যেটির মাধ্যমে প্রতিদিন বাজারে পাইকারি এবং খুচরা মূল্য জনগণকে অবহিত করা হবে, তাহলে ভালো।”

নাজিম উদ্দিন আরও বলেন, “একটি যথাযথ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিনের বাজারদর প্রতিদিন জনগণকে জানার সুযোগ করে দিলে খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়া বন্ধ করা সম্ভব।”