সৌদি আরব ও ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে অবস্থানরত নিজ নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কবার্তা জারি করেছে ওয়াশিংটন। গতকাল শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই সতর্কবার্তা দেয়।
এই সতর্কতার আওতায় রয়েছে ইসরায়েল, লেবানন, জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ওমান। মার্কিন নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, "হুতিরা সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে আসছে। এ সামরিক সংঘাত যেকোনো সময় দ্রুত মারাত্মক রূপ নেওয়ার আশঙ্কা আছে। শুধু তা-ই নয়, ইরান এবং তাদের সমমনা গোষ্ঠীগুলো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা সংস্থাসহ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো স্থাপনা কিংবা মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।"
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, "বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। সেই সঙ্গে উড়োজাহাজ চলাচল বাতিল, আকাশসীমা বন্ধ ও ভ্রমণ–সংক্রান্ত আকস্মিক বিঘ্ন ঘটার বিষয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন।"
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর ওপর হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সৌদি আরব মিত্রদেশগুলোর সাহায্য চেয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এর সূত্র ধরে ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থান কিংবা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালাতে পারে—এমন গুঞ্জনের মধ্যেই এ সতর্কবার্তা এল।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর সাংবাদিক বারাক রাভিদ জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যাম্প ডেভিডে তাঁর ছুটির সময় সংক্ষিপ্ত করেছেন। নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই তাঁর হোয়াইট হাউসে ফেরার কথা। অন্যদিকে সিএনএনের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালেক্স প্লিটসাস সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানান, ইয়েমেনে হামলার সম্ভাব্য উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার লক্ষ্যেই ক্যাম্প ডেভিডে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এবিসি নিউজ এর আগে জানিয়েছিল, ওয়াশিংটন সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে শুধু সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পশ্চিম ইয়েমেনে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার পরিধি বাড়িয়েছে হুতিরা। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী অন্যতম প্রধান নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা ও পেরিম দ্বীপ এখন তাদের দখলে। এরই মধ্যে সৌদি আরব তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেল পাইপলাইন (পেট্রোলাইন নামেও পরিচিত) দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। একটি ড্রোন হামলায় পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। রিয়াদের দাবি, ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থী মিলিশিয়ারা এ হামলা চালিয়েছে।
হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম এ পাইপলাইন। নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের বিভিন্ন অংশে সৌদি জোটের দেওয়া ‘অবরোধকে’ অবৈধ আখ্যা দিয়ে আগেই সৌদির ওপর নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছিল হুতিরা। এখন ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে তারা। ২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেওয়ার পর, ২০১৫ সালে দেশটির গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর চলমান পরিস্থিতিকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।