নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য হ্রাসের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক অগ্রগতির সূচকে এক বছরে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৫ ধাপ পিছিয়ে পড়েছে। এই উদ্বেগজনক তথ্যটি বিশ্বের অন্যতম বড় পতন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৪৫টি দেশের মধ্যে এ বছর বাংলাদেশের র‍্যাঙ্কিং ৭৯তমে নেমে এসেছে। এর আগে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ এই সূচকে ৭৫ ধাপ এগিয়ে ২৪তম স্থানে ছিল। সামগ্রিক স্কোর কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ।

বৈশ্বিক লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রতিবেদন ২০২৬ অনুযায়ী, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ—এই চারটি মূল সূচকের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি থাকলেও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে ব্যাপক পতনের কারণে বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থান বেগে পিছিয়েছে।

শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। এ বছর শিক্ষা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০০৬ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় সম্পূর্ণ সমতা অর্জিত হলেও উচ্চশিক্ষায় এখনো ব্যবধান রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য সূচকে স্কোর ৯৬, যা আগের বছরের মতোই অপরিবর্তিত। জন্মের সময় নারী-পুরুষের অনুপাতের ক্ষেত্রে পূর্ণ সমতা থাকলেও নারীদের প্রত্যাশিত আয়ু পুরুষদের তুলনায় কম। প্রতিবেদনে মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার প্রায় ৩৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। এছাড়া নারীর বিবাহবিচ্ছেদের অধিকারকে অসম এবং প্রজননস্বাধীনতাকে সীমিত বলা হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অর্জিত সাফল্য সত্ত্বেও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে বাংলাদেশের অবস্থা হতাশাজনক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি নগণ্য। এ বছর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ১৪৫টি দেশের মধ্যে ১৪২তম অবস্থানে রয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই স্কোর প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ, যা পুরুষের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। নারীর আনুমানিক বার্ষিক আয় পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ কম। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের মধ্যে নারীর হার মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশের এই বড় পতনের পেছনে প্রধানত রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের স্কোর দায়ী। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় থেকে নেমে ১২তমে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নারীরা মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশ আসন পেয়েছেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন সমতার স্কোর।

প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অসাধারণ অগ্রযাত্রাকে কেন অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না? এ ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক বাধার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গিও দায়ী। অনেক রাজনৈতিক দল এখনো নারীর প্রতিনিধিত্বকে স্বীকৃতি দেয় না বা তা প্রতীকী হয়ে দাঁড়ায়। নির্বাচনে নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের প্রকৃত সুযোগ তৈরি করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব নয়।

বৈশ্বিক লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য প্রতিবেদন–২০২৬ সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা এগিয়ে থাকলেও আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই।