পাবনা সদরে ১০ বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার প্রধান আসামির বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত এই ঘটনা ঘটে, তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, জুমার নামাজের পর স্থানীয়রা জড়ো হয়ে আসামির বাড়িতে হামলা চালায়। দ্বিতলা বাড়িটির মালামাল ভাঙচুর করা হয় এবং দরজা-জানালা খুলে ফেলা হয়। বড় হাতুড়ি দিয়ে ছাদ ভাঙা দেখা গেছে। একপর্যায়ে বাড়ির অবকাঠামোর অনেকাংশই ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

ঘটনাস্থলে আগে থেকেই পুলিশ মোতায়েন থাকলেও গ্রামবাসীর সংখ্যা বেশি থাকায় তারা বাধা দিতে পারেনি। পরে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং এলাকাটি শান্ত হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে মুক্তকণ্ঠকে পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "ঘটনাস্থলে আগে থেকে পুলিশ মোতায়েন ছিল, তবে গ্রামবাসীর তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় সে সময় বাধা দেওয়া যায়নি। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। পরিস্থিতি এখন শান্ত।"

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি জানান, জুমার নামাজ শেষে আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ ওই বাড়ির সামনে জড়ো হন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় বাড়ির লোকজন পুলিশের সহযোগিতায় পালিয়ে যান। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা বাড়ির আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দেয়াল পর্যন্ত ভেঙে ফেলে। বর্তমানে দোতলা বাড়িটি কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

৯ সেপ্টেম্বর চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েশিশুটি নিখোঁজ হয়। ১৬ সেপ্টেম্বর বাড়ির পাশের ডোবা থেকে তার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দুজন হলেন প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিক (৫৫) ও তাঁর বাড়ির ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলী (২১)।

শিশুটির পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে শিশুটি বাবার সঙ্গে স্থানীয় বাজারে যায়। বাজার শেষে বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরে ব্যাগ মায়ের হাতে দিয়ে সে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে শিশুটির স্যান্ডেল পাওয়া যায়। পরদিন শিশুটির বাবা পাবনা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

১৫ সেপ্টেম্বর শিশুটির স্বজন, সহপাঠী ও প্রতিবেশীরা জেলা শহরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। এদিন শিশুটির বাবা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে অপহরণের মামলা করেন। পরের দিন সকালে বাড়ির পাশের ডোবা থেকে বস্তায় ভরা শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। বিকেলেই দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর শিশুটির বাবার করা মামলায় হত্যা ও ধর্ষণের ধারা যুক্ত করা হয়। আসামি দুজন বর্তমানে কারাগারে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ। আসামিদের পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, গ্রেপ্তার মোস্তফা প্রামাণিক মুদিদোকানি। তিনি ও তাঁর বাড়ির ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলী শিশুটিকে হত্যার আগে মুদিদোকানের পেছনে নিয়ে ধর্ষণ করেন। এ সময় শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঘটনা আড়াল করতে মোস্তফা ও ইয়াছিন শিশুটিকে খুঁজতে বের হওয়ার নাটকও করেন। পরে মোস্তফা লাশটি নিয়ে বাড়ির খাটের নিচে রেখে দেন। এরপর লাশটি খণ্ড করে বস্তায় ভরে দুটি ইট বেঁধে বাড়ির পাশের ডোবায় ফেলে দেন। পরে অবস্থা বেগতিক দেখে ডোবা থেকে তাঁরা লাশটি তুলে সেপটিক ট্যাংকে ফেলারও চেষ্টা করেন। তবে দুর্গন্ধে কুকুরের দল এগিয়ে আসায় তাঁরা ব্যর্থ হন। এরপর লাশটি ডোবাতেই পড়ে ছিল। পরে স্থানীয় লোকজন থানায় খবর দিলে পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তারের পর দুজনই হত্যা ও ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন।

শিশুটির এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে না পেরে স্থানীয় বাসিন্দারা আজ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। প্রধান আসামি মোস্তফা প্রামাণিকের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। ভাঙচুরে অংশ নেওয়া কয়েকজন জানান, শিশুকে যাঁরা ধর্ষণ করে হত্যা করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দেখতে চান এলাকাবাসী। দেশে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হওয়া দরকার; কিন্তু শাস্তি হয় না। কোনো ধর্ষণেরই দৃশ্যমান বিচার হয় না। তাই ধর্ষণে জড়িত আসামির কোনো চিহ্ন তাঁরা রাখতে চান না।