পাবনার দোগাছি ইউনিয়নের কুলোনিয়া গ্রামে এক শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত মোস্তফার বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ এখনো অব্যাহত রয়েছে। হাতুড়ি ও বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে বাড়ির বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলা হচ্ছে এবং ফাউন্ডেশনের রডগুলোও কাটা হচ্ছে। এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখার জন্য স্থানীয়দের ভিড় জমেছে সেখানে। তবে বাড়িটি প্রায় ভেঙে ফেলা হলেও মামলার অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল না হওয়ায় শিশুটির স্বজনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর থেকে বাড়িটি ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) পর্যন্ত এই কাজ চলতে দেখা গেছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে দেখা যায়, দোতলা বাড়িটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং পুরো এলাকাটি এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কেবল দুটি কক্ষের ফাউন্ডেশনের রড কাটার কাজ বাকি রয়েছে, যা শেষ হলেই বাড়ি ভাঙার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হবে। উল্লেখ্য, কেটে নেওয়া রডগুলো বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে এবং ইট ও বালু গাড়িতে করে অন্যত্র সরিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

বাড়ি ভাঙার কাজে অংশ নেওয়া আতাইকুলার মাধপুর এলাকার রুবেল হাসান বলেন, “ধর্ষক ও খুনি মোস্তফার বাড়ির কোনো চিহ্ন রাখা হবে না। ইট তো দূরের কথা, একমুঠো বালুও এখানে রাখা হবে না। জায়গাটি পুকুর হয়ে যাবে যা নিদর্শন হিসেবে থাকবে যে ধর্ষকের পরিণতি কী হয়।”

বাড়ি ভাঙার কাজে নিয়োজিত শ্রমিক নাসিম হোসেন জানান, তারা গত কয়েক দিন ধরে বাড়িটি ভাঙছেন এবং প্রতিদিন ৭০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন। এর আগে অন্য একটি দলও বাড়ি ভাঙার কাজ করেছে। হাতুড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে বাড়ির অবকাঠামো ভাঙার পাশাপাশি ফাউন্ডেশনের রড কেটে নেওয়া হচ্ছে, যা বাজারে প্রতি কেজি ৪৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

জানা গেছে, সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত বাড়ির ভাঙা অংশ ও ফাউন্ডেশনের রড কাটার কাজে আরও একটি দল অংশ নেয়।

এদিকে বাড়ি ভাঙার কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল না করায় চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিশুটির স্বজনেরা। তাদের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে হবে এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

শিশুটির দাদা আব্দুস সোবহান বলেন, “এখনো চার্জশিট দেওয়া হয়নি। এত দিনে চার্জশিট দিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। এতে প্রশাসনের গাফিলতি আছে বলে মনে হচ্ছে।” তিনি দ্রুত তদন্ত শেষ করে মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানান।

শিশুটির আরেক স্বজন রমজান আলী বলেন, “দোতলা বাড়ি একে একে ভেঙে ফেলা হলো, কাজও প্রায় শেষ। বাড়ির কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই, অথচ এখনো মামলার কাগজপত্রের কাজ শেষ হয়নি বলে শুনছি। এত দিনে তো বিচার হয়ে যাওয়ার কথা। সবার কাছে আমাদের একটাই দাবি একটি শিশুর ধর্ষণের ঘটনা যেন টাকার কাছে বিক্রি হয়ে না যায়। পুলিশ প্রশাসনকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।”

এই বিষয়ে পাবনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন, “মামলার অগ্রগতি হচ্ছে। ফরেনসিক রিপোর্ট হাসপাতালে চলে এসেছে। দ্রুতই আমরা চার্জশিট দিয়ে দেব।”

গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় তৃতীয় শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী। নিখোঁজের সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে কুলোনিয়া গ্রামের বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এই ঘটনায় প্রতিবেশী মোস্তফা কামাল ও তার ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ৯ সেপ্টেম্বর মাগরিবের পর মোস্তফার দোকানের পেছনের ঘরে শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে মরদেহটি বস্তাবন্দি করে ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।

পুলিশ আরও জানায়, ঘটনাটি আড়াল করতে আসামিরা নিজেরাও শিশুটিকে খোঁজার কাজে অংশ নিয়েছিলেন। রিমান্ডে মোস্তফা ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশের দাবি। তবে ইয়াছিন ধর্ষণ বা হত্যার কথা অস্বীকার করে কেবল হত্যার পর সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন। এ ঘটনার আলামত ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং সেখান থেকে রিপোর্ট এলেই আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।