১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউরোপে যে উদারনৈতিক রাজনীতির ধারা বহমান ছিল, এখন তার জোয়ার অনেকটাই কমে এসেছে। নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, লিথুনিয়া, জার্মানি, পোল্যান্ড, হল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, গ্রিস, ইতালি—ইউরোপের প্রায় সব দেশেই ডানপন্থী ও কট্টরবাদী দলগুলো ক্ষমতায়, কোয়ালিশন সরকারে কিংবা পার্লামেন্টে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিকেরা যে সামাজিক বাজার অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, সেই মডেলটি এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। করোনা মহামারি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায়ন, ইউক্রেন ও ইরানে যুদ্ধ, জ্বালানিসংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং ইউরোপ অভিমুখী শরণার্থীদের স্রোত—সব মিলিয়ে কট্টরবাদী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
সর্বশেষ জার্মানির রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে স্যাক্সনি-আনহাল্টের রাজ্য নির্বাচনে ডানপন্থী ও চরম বর্ণবাদী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) ঐতিহাসিক সাফল্য পেয়েছে। প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে দলটি সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক দল (সিডিইউ) সেখানে মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোটে সীমাবদ্ধ। একই মাসের ২০ তারিখে মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন ও বার্লিনে রাজ্য-পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যার ফলাফল নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। দেশজুড়ে জনমত জরিপে এএফডির শক্ত অবস্থান স্পষ্ট।
এই ফলাফল শুধু একটি রাজ্য নির্বাচনের জয় নয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির রাজনৈতিক ইতিহাসে এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বড়। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎসের নেতৃত্বেও তাঁর নিজ দলের ভেতরে প্রশ্ন উঠছে।
এএফডি দলটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মূলত ইউরোপীয় মুদ্রা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতির সমালোচক হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দলটির অবস্থান অনেক বেশি ডান দিকে সরে যায়। বিশেষ করে ২০১৫-১৬ সালের শরণার্থী সংকটের পর অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি এএফডির প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। এখন দলটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জলবায়ুনীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জার্মানির নিরাপত্তা ও অভিবাসননীতি—প্রায় প্রতিটি বড় প্রশ্নেই প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে।
এএফডির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—দলটি মানুষের অসন্তোষকে রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিতে পারছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ, আবাসন ব্যয় মানুষের নাগালের বাইরে, অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক, অর্থনীতির দুর্বলতা ও শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ—এসব বিষয়ে জনগণের ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে এএফডি একটি সরল বার্তা দিচ্ছে। তারা বলছে, "প্রচলিত দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে, আমরাই পরিবর্তন আনব।" কোনো বিকল্প পরিকল্পনা ছাড়াই এই ধরনের বক্তব্য জটিল সমস্যার সহজ সমাধান হিসেবে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
২০২৫ সালের বুন্দেশটাগ নির্বাচনে সিডিইউ ও ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন (সিএসইউ) সরকার গঠন করে। ৬৩০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন জোটের আসনসংখ্যা ২০৮। সেই নির্বাচনে এএফডি পায় ১৫০টি আসন, যা ২০২১ সালের নির্বাচনে ছিল মাত্র ৬৯টি। এখন এএফডি জার্মান পার্লামেন্টের প্রধান বিরোধী দল।
সরকার গঠনের পর চ্যান্সেলর মের্ৎসের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের বাস্তব কর্মক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান। অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, পেনশন, অভিবাসন ও অভ্যন্তরীণ সংস্কার নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপে ক্ষমতাসীন জোটের সমর্থন ২২ শতাংশে নেমে এসেছে, অন্যদিকে এএফডি ২৭ শতাংশ সমর্থন পেয়ে এগিয়ে আছে। সামাজিক গণতান্ত্রিক দল ও সবুজ দল যথাক্রমে ১২ ও ১৪ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছে। সমস্যা এখন শুধু সরকারের জনপ্রিয়তা নয়, নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটও।
গবেষকরা বলছেন, জার্মান রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তিন ধরনের ভোটারের কারণে। প্রথমত, যাঁরা এএফডির ডানপন্থা ও বর্ণবাদী আদর্শের সঙ্গে সত্যিই একমত, বিশেষত অভিবাসনবিরোধী, জাতীয়তাবাদী ও কঠোর আইনশৃঙ্খলা নীতির সমর্থক। দ্বিতীয়ত, অন্য দলগুলোর ওপর হতাশ হয়ে প্রতিবাদী ভোট যাঁরা দেন। তৃতীয়ত, যাঁরা মনে করেন সিডিইউ, এসপিডি ও সবুজ দলের মতো প্রচলিত দলগুলো তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। এই তৃতীয় গোষ্ঠীটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এএফডি জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের অসন্তোষকে ভোটে রূপান্তর করতে পারছে।
যদিও এএফডি মূলত সাবেক পূর্ব জার্মানির রাজ্যগুলোতে শক্তিশালী, এখন পশ্চিমেও এর উত্থান ছড়িয়ে পড়েছে। তাই শুধু পূর্ব জার্মানির মানসিকতা দিয়ে এই উত্থান ব্যাখ্যা করা ভুল হবে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বঞ্চনার অনুভূতি এই ভোটের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চ্যান্সেলর মের্ৎসের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। প্রথমত, তিনি নেতৃত্ব ধরে রেখে সরকারের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন—অর্থনীতি, জ্বালানি, অভিবাসন, পেনশন, আমলাতন্ত্র ও জীবনযাত্রার ব্যয়—এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সফলতা দেখিয়ে জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করতে পারেন। অথবা দ্বিতীয় পথ—পরপর কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট বড় পরাজয়ের মুখে পড়লে দলের ভেতর থেকে নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি উঠতে পারে।
জার্মানির অভিবাসী সংগঠনগুলোর রাজ্য নেটওয়ার্ক (লামসা) ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। এএফডির নির্বাচনী বিজয় অভিবাসী সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জার্মানির টাজ পত্রিকা জানিয়েছে, ১২ সেপ্টেম্বর জার্মানির ২৯টি শহরে এএফডি-বিরোধী বিক্ষোভে ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নাৎসি অতীতের স্মৃতি জার্মানির চরম ডানপন্থী রাজনীতির জন্য এখনো একটি বড় বোঝা। এই অতীত থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিতে তারা নানা ধরনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে আনছে। অতীতকে সরাসরি অস্বীকার করা কঠিন বলে তাদের একটি অংশ যুক্তি দেয়—নাৎসি অতীতকে ঘিরে অব্যাহত স্মরণ ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি জার্মানির স্বাভাবিক বিকাশ ও প্রচলিত রাজনৈতিক 'ব্যবস্থা' থেকে বেরিয়ে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যে দেশ দুটি বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে, সেই জার্মানিতে নতুন করে নাৎসি আদর্শের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত নব্য ডানপন্থী শক্তি ও এএফডির ক্রমবর্ধমান উত্থান দেশটির রাজনীতিতে উদ্বেগ ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
সরাফ আহমেদ মুক্তকণ্ঠের জার্মান প্রতিনিধি