জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)-র সম্ভাব্য উত্থান নিয়ে দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে। আজ রোববার ভোট গ্রহণ চলছে। প্রাক্-নির্বাচনী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এএফডি সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ ভোট পেতে পারে। এই ফলাফল বাস্তবায়িত হলে জার্মানির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো রাজ্যে সরকার গঠনে সক্ষম হবে দলটি। তবে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো জোট সরকার গঠনে সফল হলে এএফডির ক্ষমতায় আসা কঠিন হয়ে পড়বে। তবুও, এএফডি-র এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সংবাদমাধ্যম, গণতন্ত্রপ্রেমী নাগরিক ও অভিবাসীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
জার্মানির শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ‘ডের স্পিগেল’ জানিয়েছে, গত সপ্তাহে সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল নাগরিকদের সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, 'এটি শুধু স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে ডানপন্থীদের উত্থান নয়, বিষয়টি এখন সমগ্র জার্মানির ঘটনা। তাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় সবাইকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।' গত ৩০ আগস্ট বার্লিনে এক অনুষ্ঠানে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) এই রাজনীতিক বলেন, 'আমার মনে হয়, গণতন্ত্রের জন্য গত কয়েক দশকে আমাদের যা করতে হয়নি, এখন আমাদের আবার এই গণতন্ত্রের জন্য সত্যিকার অর্থে লড়াই করতে হবে।'
মেরকেল জোর দিয়ে বলেন, 'অধিকাংশ মানুষ এএফডিকে ভোট দেয় না। তবে এটা ঠিক যে নতুন ফেডারেল বা পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে দলটি অত্যন্ত শক্তিশালী। পশ্চিমের পুরোনো ফেডারেল রাজ্যগুলোতেও তারা আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে। বার্লিনার ফেস্টস্পিলে মিলনায়তনের ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিষয়টি এটি এখন সমগ্র জার্মানির একটি বিষয় হয়ে উঠেছে।' এএফডি এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে উল্লেখ করে সাবেক এই চ্যান্সেলর আরও বলেন, 'সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের সব আলোচনার বিষয়বস্তু যেন তারাই নির্ধারণ করছে। ফলে অন্য দলগুলো আসলে কী চায়, সেটাই আর বোঝা যাচ্ছে না।'
স্যাক্সনি-আনহাল্টসহ জার্মানির বেশ কয়েকটি রাজ্যে এএফডি চরম ডানপন্থী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে দলটি আদালতে মামলা করলেও মূল মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
অন্যদিকে, স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডি জয়ী হলে রাজ্যটি দেউলিয়ার পথে যেতে পারে বলে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন জার্মানির শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার রুন্ডশাউ’ পত্রিকায় জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চের পরিচালক মিশায়েল হ্যুথার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামীতে কেউ অভিবাসিত না হলে ২০৪৫ সালের মধ্যে স্যাক্সনি-আনহাল্টের কর্মক্ষম জনসংখ্যা প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে যাবে। অভিবাসনবিরোধী এএফডির নীতি অনুসরণ করলে তা এই রাজ্যের জন্য ‘ধ্বংসাত্মক’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন হ্যুথার। এ ছাড়া দলটির উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তব্য অর্থনৈতিক বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বিদেশি নার্স, চিকিৎসক বা নির্মাণশ্রমিকেরা এই রাজ্যে আসতে নিরুৎসাহিত হবেন।
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চের অনুমান, এএফডি ক্ষমতায় এলে স্যাক্সনি-আনহাল্টে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বছরে শূন্য দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে সংকুচিত হতে পারে রাজ্যটির অর্থনীতি।
এর বিপরীতে এএফডির বক্তব্য হলো, বিদেশি শ্রমিকেরা জার্মানদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছেন। দলটি পুনরুদ্ধার কর্মসূচির মাধ্যমে রাজ্য ছেড়ে যাওয়া দক্ষ জার্মানদের ফিরিয়ে আনতে চায়। তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে সন্দিহান অর্থনীতিবিদ মিশায়েল হ্যুথার। তাঁর ভাষায়, 'এই জার্মানরা কোথা থেকে আসবে, তা আমি জানি না।' বরং তাঁর আশঙ্কা, উচ্চশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত কর্মীরা শুরু থেকেই এ রাজ্যে আসতে চাইবেন না।
আজ রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোট গ্রহণ চলার পর রাতেই ফলাফল ঘোষণার কথা রয়েছে।