যশোরের ভবদহ অঞ্চলে চারদিকে পানি। ঘরবাড়ির উঠান, যাতায়াতের পথ এবং ফসলের জমি—সবই একাকার হয়ে গেছে। এই দৃশ্যের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। কোথাও নৌকা, কোথাও বাঁশের সাঁকো; আবার কোথাও বুক সমান পানি মাড়িয়ে করতে হচ্ছে যাতায়াত। বছরের পর বছর এমন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলেও তাদের মনের আক্ষেপ দূর হয়নি। গৃহবধূ শিবালী দাস তার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "আমরা হচ্ছি জলজ প্রাণী। সাপ-ব্যাঙের সঙ্গে আমাদের বসবাস। সরকার ও আমলারা মিলে আমাদের জলজ প্রাণী বানিয়ে রাখছে। আমরা এ জলজ প্রাণী হয়ে বাঁচতে চাই না"।
অভয়নগর উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের বাসিন্দা শিবালী দাসের কথায়ই প্রতিফলিত হয় এই অঞ্চলের প্রত্যেক বাসিন্দার দীর্ঘদিনের অসহায়ত্ব। জলাবদ্ধতা যেন তাদের জীবনের স্থায়ী সঙ্গী। বর্ষা ঋতুতে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। পানি নামতে দেরি হলে রোগবালাই বাড়ে, ফসল নষ্ট হয়, শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। অনেক পরিবারের জন্য নিজের ঘর তখন দ্বীপে পরিণত হয়।
ডুমুরতলা গ্রামের স্কুলশিক্ষক শিবপদ বিশ্বাস জানান, গ্রামের ১৫৫টি বাড়ির মধ্যে মাত্র ছয়টি ছাড়া বাকি সব বাড়ির উঠান দুই থেকে তিন ফুট পানির নিচে। সামান্য বৃষ্টি হলেই বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু জায়গায় যেতে হয়। মণিরামপুরের সুজাতপুর গ্রামের গৃহবধূ বিথী রাণী বলেন, "আমাদের থাকার জায়গা নেই। আমাদের রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া সব রাস্তায়"।
এ বিষয়ে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ অভিযোগ করেন, যে নদী কাটা হয়েছিল সেটি ভরাট হয়ে গেছে। যে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল তা পুরোপুরি অপসারণ করা হয়নি। তিনি বলেন, "এখন যে উদ্ভূত পরিস্থিতি, এজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বহীনতা প্রধানত দায়ী"।
এদিকে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, প্রকল্পের প্রায় ৭৩ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আশাবাদী যে, নদী খননের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে এবং জলাবদ্ধতা অনেকটা কমে আসবে। প্রকল্পের সুফল পেলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকবে না বলে তিনি আশা করছেন।