মানুষের জ্ঞান যতদিন থাকবে, মতভেদও ততদিন থাকবে। কারণ মতের ভিন্নতা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং মানবজ্ঞান ও অস্তিত্বের এক স্বাভাবিক পরিণতি। একই ঘটনার সামনে দাঁড়িয়েও মানুষ ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, যার সাক্ষ্য বহন করে ইতিহাসের প্রতিটি যুগ ও সভ্যতা। তবে প্রকৃত প্রশ্ন হলো—মতভেদ কেন জন্ম নেয়, এর সীমা কোথায় এবং সত্য অনুসন্ধানে এর ভূমিকা কী?

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার মতে, সত্য একাধিক হতে পারে না, কারণ বাস্তবতার উৎস এক এবং মহাবিশ্ব একটি অভিন্ন নিয়মে পরিচালিত। তবে সত্যের পথে মানুষের যাত্রা একরৈখিক নয়। মানুষের সীমিত দৃষ্টিশক্তি, অসম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা এবং ভাষার বহুমাত্রিকতার কারণে একই সত্যের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও উপলব্ধির জন্ম হয়।

মতভেদ তখনই কল্যাণকর হয়, যখন তা যৌথভাবে সত্যের অনুসন্ধান করে। কিন্তু যখন সত্যের পরিবর্তে ব্যক্তি, দল বা মতবাদই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখনই জন্ম নেয় বিরোধ। প্রথম ক্ষেত্রে মতভেদ জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে, আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তা সমাজকে বিভক্ত করে। ফলে প্রতিটি ইখতিলাফ সমান নয়; কোনোটি হিকমাহর পথ দেখায়, আবার কোনোটি নফসানি সংঘাতে পরিণত হয়।

ফিতরাতি ব্যাখ্যায় মতভেদের উৎপত্তি ঘটে চারটি স্তরে। প্রথমত, বাস্তবতার জটিলতা; যেখানে অনেক বিষয় বহুস্তরীয় হওয়ায় পর্যবেক্ষক ভিন্ন ভিন্ন দিক দেখতে পান। দ্বিতীয়ত, ভাষা; যেখানে একটি শব্দ বা বাক্য বহুমাত্রিক অর্থ ধারণ করতে পারে। তৃতীয়ত, অভিজ্ঞতা; যা মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের দ্বারা প্রভাবিত হয়। চতুর্থত, নৈতিক অবস্থা; কারণ ব্যাখ্যা শুধু বুদ্ধির কাজ নয়, বরং মানবিক আখলাকও এখানে ভূমিকা রাখে।

এই দর্শনে মতভেদকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো 'তানাওউ' বা বৈচিত্র্য, যেখানে ভিন্ন মতগুলো পরস্পরকে অস্বীকার না করে সত্যের বিভিন্ন দিক উন্মোচন করে। দ্বিতীয়টি হলো 'ইজতিহাদি মতভেদ', যেখানে আন্তরিক অনুসন্ধান সত্ত্বেও প্রমাণের মূল্যায়ন বা ব্যাখ্যার পার্থক্যের কারণে ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসে। এখানে বিনয় অপরিহার্য, কারণ প্রতিটি ব্যাখ্যা আংশিক হতে পারে। তবে যখন নফস, ক্ষমতা বা দলীয় আনুগত্য ব্যাখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন এটি নৈতিক সংকটে পরিণত হয়। তৃতীয়টি হলো 'বিভ্রান্তিকর মতভেদ', যেখানে মানুষ প্রমাণ অনুসরণ না করে প্রমাণকে নিজের অবস্থানের অধীন করতে চায়। ফলে সংলাপ সংঘাত ও ইখতিলাফ বিভেদে রূপান্তরিত হয়।

ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা সব মানুষকে একই চিন্তাপদ্ধতিতে আবদ্ধ করার কথা বলে না, কারণ তা ফিতরাতের পরিপন্থী। লক্ষ্য মতের বিলুপ্তি নয়, বরং নৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। এর মূল নীতি হলো—কোনো মতই নিজেকে সত্যের সমার্থক মনে করতে পারে না; মানুষ কেবল সত্যের অনুসন্ধানকারী, মালিক নয়। তাই ইখতিলাফের আদব মেনে প্রতিপক্ষকে বোঝা এবং নিজের দুর্বলতা অনুসন্ধান করা ইলমের শর্ত।

এই দর্শন মনে করে, সব মতের মূল্য সমান নয়। সত্যনিষ্ঠা, নৈতিক পরিণতি এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যের ভিত্তিতে মতের মর্যাদা নির্ধারিত হয়। বহুত্ব স্বীকার করা হলেও আপেক্ষিকতাকে এখানে স্থান দেওয়া হয়নি, কারণ সব মত সমান সত্য হলে সত্যের ধারণাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

ইখতিলাফ যদি ফিতরাত, আদব ও ইনসাফের অধীনে পরিচালিত হয়, তবে তা হিকমাহর দ্বার উন্মুক্ত করে। এর সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হলো 'তাকামুল' বা পারস্পরিক পূর্ণতা। মানুষ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অসম্পূর্ণ উপলব্ধির বাহক। একজনের অভিজ্ঞতা অন্যজনের সীমাবদ্ধতা পূরণ করতে পারে।

পরিশেষে, ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় মতভেদ কোনো অনিবার্য অকল্যাণ বা রোমান্টিক আদর্শ নয়, বরং এটি সত্যের দীর্ঘ অভিযাত্রার স্বাভাবিক সঙ্গী। প্রকৃত ইলম সব কণ্ঠকে এক কণ্ঠে পরিণত করে না, বরং বহু কণ্ঠকে এমন এক নিয়মে স্থাপন করে যেখানে ভিন্নতা সত্যের দিকেই সমবেত অগ্রযাত্রায় পরিণত হয়।

—মুসা আল হাফিজ: লেখক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক এবং ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান।