ঝিনাইদহ জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও জনবলের তীব্র সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জেলার সদর হাসপাতালসহ ছয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই অনুমোদিত পদের অর্ধেকও চিকিৎসক নেই। ফলে কোথাও অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের অভাবে অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকলে, আবার কোথাও টেকনিশিয়ান ও সনোলজিস্টের ঘাটতিতে এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে ৪৯৫ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৮৮টি হলেও দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৩৮ জন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং চিকিৎসকসংকটের কারণে সীমিত জনবল দিয়ে সেবা দিতে কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। এছাড়া হাসপাতালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ ২৫৫টি হলেও নিয়মিত কর্মরত আছেন ১৬৬ জন; আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আরও ২১ জন কাজ করছেন।

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "হাসপাতালে অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসক ও জনবল কম রয়েছে। এরপরও অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলে আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। জনবলসংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া গেলে রোগীদের সেবার মান আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।"

জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিস্থিতি আরও প্রকট। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩৭টি হলেও কর্মরত আছেন ১৮ জন। এর মধ্যে তিনজন দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কর্মস্থলে না থাকায় কার্যত ১৫ জন চিকিৎসক দিয়ে সেবা চলছে। হাসপাতালের অনুমোদিত ১৬৭ জন জনবলের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৯৯ জন। অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে অপারেশন থিয়েটার বন্ধ রয়েছে। এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও সেবা নিয়মিত হয় না। প্যাথলজিস্টের তিনটি পদের বিপরীতে একজন কর্মরত থাকায় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও সবসময় করা সম্ভব হয় না। হাসপাতালের একমাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটিও অধিকাংশ সময় বিকল থাকে বা চালক না থাকায় অফিস সহকারী দিয়ে চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রহিম উদ্দিন বলেন, "সকাল থেকে হাসপাতালে বসে আছি, কিন্তু এখনো ডাক্তার দেখাতে পারিনি। আমরা গরিব মানুষ। বারবার শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়।"

হরিশপুর গ্রামের সালমা খাতুন বলেন, "বাচ্চাকে নিয়ে অনেক দূর থেকে এসেছি। ডাক্তার না থাকায় ঠিকভাবে চিকিৎসা পাচ্ছি না। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হয়, সেখানে খরচ অনেক বেশি।"

কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যা থাকলেও বর্তমানে ১২০ জন রোগী ভর্তি। চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪৫টি হলেও নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন ২২ জন। অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট না থাকায় কোনো অপারেশন হচ্ছে না। সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেও এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা টেকনিশিয়ান ও সনোলজিস্টের অভাবে বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ ২২২টি হলেও নিয়মিত কর্মরত আছেন ১২৮ জন; আউটসোর্সিংয়ে ১৩ জন।

কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমানুল্লাহ আল মামুন বলেন, "চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ানসংকটের কারণে কিছু সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না। জনবল পাওয়া গেলে সেবাগুলো আরও ভালোভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।"

শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যা থাকলেও ১২৬ জন রোগী ভর্তি। চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪৯টি হলেও কর্মরত আছেন ২৩ জন (চারজন প্রেষণে)। শুধুমাত্র সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। এক্স-রে সেবা চালু থাকলেও আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা সনোলজিস্টের অভাবে বন্ধ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ ১৪১টি হলেও নিয়মিত কর্মরত আছেন ৮২ জন; আউটসোর্সিংয়ে ১৫ জন।

শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রাশেদ আল মামুন বলেন, "চিকিৎসক ও জনবলসংকট রয়েছে। সীমিত জনবল দিয়েই রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবল পাওয়া গেলে সেবার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।"

মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যা থাকলেও ৮৫ জন রোগী ভর্তি। চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪০টি হলেও নিয়মিত কর্মরত আছেন মাত্র ১৩ জন। অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ ও কনসালট্যান্ট সার্জন না থাকায় অপারেশন বন্ধ। এক্স-রে সেবা টেকনিশিয়ানের অনুপস্থিতিতে বন্ধ, আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবাও সনোলজিস্টের অভাবে বন্ধ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ ২১১টি হলেও কর্মরত আছেন ১০৪ জন; আউটসোর্সিংয়ে ১০ জন।

মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার বলেন, "চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞসংকটের কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ ও সার্জন না থাকায় অপারেশন বন্ধ রয়েছে। জনবলসংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।"

জেলার ছয় উপজেলার মধ্যে কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য সংগ্রহের জন্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় হাসপাতালটির চিকিৎসক ও জনবলসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, "জেলার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও জনবলসংকট রয়েছে অনেক আগে থেকেই। এটা শুধু ঝিনাইদহে না, সারা দেশেই; তবে সেবার মান উন্নয়নে আমরা কাজ করছি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ও জনবলসংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।"
তিনি আরও বলেন, "চিকিৎসক ও জনবলসংকটের কারণে সীমিত সক্ষমতার মধ্যেই রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ করা গেলে উপজেলা পর্যায়েই আরও বেশি রোগীকে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।"