ঢাকা শহরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সন্তান জন্মদানের জন্য বর্তমানে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে প্রায় ৬০ শতাংশ শিশুর জন্ম হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। মুক্তকণ্ঠের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সন্তানের প্রসবকালীন খরচের চাপে অনেক পরিবার চরমভাবে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। তবে সঠিক খোঁজ নিলে বাড়ির কাছের সরকারি হাসপাতালে অত্যন্ত স্বল্প খরচে মানসম্মত সেবা পাওয়া সম্ভব। মোহাম্মদপুরের একজন স্কুলশিক্ষক তাঁর দুই সন্তানের জন্মের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যেখানে তাঁর মোট খরচ হয়েছে মাত্র ৭৫ টাকা। শিক্ষক নাজমুন নাহারের সেই অভিজ্ঞতার কথা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

নাজমুন নাহার লিখেছেন, “আমার দুই সন্তানের ডেলিভারিতে খরচ হয়েছে মাত্র ৭৫ টাকা। তা–ও দ্বিতীয় সন্তানের সময় জরুরি সেবা নিতে হওয়ায় ৬৫ টাকার টিকিট কাটতে হয়েছিল বলে খরচ বেড়েছে। প্রথম সন্তানের জন্মের সময় ১০ টাকার টিকিট কেটেছিলাম, খরচ বলতে সেটুকুই। তবে দুই সন্তানের জন্য পরে আরও ২০০ টাকা খরচ হয়েছে, সেটা হাসপাতাল থেকে তাদের জন্মসনদ নিতে।”

মোহাম্মদপুরে ভাড়া বাসায় স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে সংসার শুরু করেন নাজমুন। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই পেশায় চাকরিজীবী। ২০২১ সালের শুরুর দিকে তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম হয় এবং চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয় তাঁর দ্বিতীয় কন্যা।

উভয় সন্তানের জন্মই হয়েছে মোহাম্মদপুরের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতালে, যা মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার নামেও পরিচিত। প্রথমবার গর্ভধারণের পর সাধারণ অনেকের মতোই তিনি ঢাকার বেশ কিছু নামকরা চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে গিয়েছিলেন। তবে সেখানে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল হতাশাজনক। তিনি জানান, চিকিৎসকের খ্যাতি যত বেশি, সিরিয়ালের দীর্ঘতা এবং ভোগান্তি তত বেশি।

প্রাইভেট চেম্বারে নির্দিষ্ট সময়ে সিরিয়াল নেওয়ার পর সেখানে গিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। নাজমুন জানান, সন্ধ্যা ৬টার সিরিয়াল হয়ে থাকলেও চিকিৎসকের কক্ষে পৌঁছাতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লেগেছে। তাঁর পরিচিত অনেক বন্ধুর অভিজ্ঞতাও একই রকম; কেউ কেউ সন্ধ্যা ৭টায় সিরিয়াল দিয়ে রাত ১২টার পর চিকিৎসক দেখাতে পেরেছেন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় হাজার হাজার টাকা খরচ করে এমন দীর্ঘ অপেক্ষা করা অত্যন্ত কষ্টকর বলে তিনি মনে করেন।

অবশেষে প্রথম গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময়ে তিনি বাড়ির কাছের এই মা ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মাত্র পাঁচ টাকার টিকিট কেটে তিনি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শ নেন, যেখানে প্রাইভেট চেম্বারের তুলনায় অপেক্ষার সময় ছিল অনেক কম।

নাজমুন মনে করেন, সরকারি হাসপাতালে সিরিয়াল কিছুটা দীর্ঘ হলেও সামগ্রিক সময়ের হিসেবে এটি প্রাইভেটের চেয়ে অনেক সুবিধাজনক। চিকিৎসকরা অত্যন্ত যত্ন সহকারে রোগী দেখেন। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরিবেশও বেশ পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন।

গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ভিটামিন জাতীয় ওষুধগুলো এই হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নাজমুন নাহার আরও জানান, তাঁর দুটি সন্তানের জন্মই হয়েছে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে। প্রসবকালীন কোনো জটিলতা না থাকায় তাঁর সরাসরি চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়নি। হাসপাতালের দক্ষ মিডওয়াইফরাই প্রসবের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, “তাদের দক্ষতা দেখে অবাক হয়েছি। একেকজন মায়ের পেছনে কয়েকজন করে মিডওয়াইফ থাকেন।”

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক প্রসবের বিষয়ে অধিক উৎসাহ প্রদান করে। তবে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার জন্য আলাদা কোনো বড় খরচ নেই। প্রাথমিক টিকিটের খরচেই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। তবে কোনো ওষুধ হাসপাতালে না থাকলে তা বাইরে থেকে কিনে আনতে হয় এবং সেই খরচ রোগীকে বহন করতে হয়।

হাসপাতালটিতে ওয়ার্ডের পাশাপাশি এসি ও নন-এসি দুই ধরনের কেবিন সুবিধা রয়েছে। খালি থাকা সাপেক্ষে এই কেবিনগুলো পাওয়া যায়। সঠিক খরচ জানা না থাকলেও নাজমুন নিশ্চিত করেন যে, কেবিনের ভাড়া হাজার টাকার কম।

প্রথম সন্তানের জন্ম হয়েছিল দুপুরে এবং দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়েছিল সন্ধ্যায়। উভয় ক্ষেত্রেই তিনি রাতটুকু হাসপাতালে কাটিয়ে কোনো জটিলতা ছাড়াই হেঁটে বাসায় ফিরেছেন। সরকারি হাসপাতাল নিয়ে সাধারণ মানুষের অনেক অভিযোগ থাকলেও, প্রাইভেট ও সরকারি হাসপাতালের সেবার পার্থক্য নিজের অভিজ্ঞতায় অনুভব করেছেন তিনি।