খাগড়াছড়ি পৌর শহরের অতি কাছে অবস্থিত উত্তর গঞ্জপাড়া এলাকার প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দা চেঙ্গী নদীর কারণে যাতায়াতের সংকটে। স্থায়ী সেতু না থাকায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নৌকাযোগে পারাপার করতে হচ্ছে তাদের। এই অনিশ্চয়তা শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যঘাত ঘটছে। একমাত্র নৌকাই এখন তাদের জীবনযাত্রার ভরসা।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিষ্ঠার পরও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও গঞ্জপাড়ার মানুষের নিরাপদ যাতায়াতের কোনো সমাধান হয়নি। প্রতি বর্ষায় নদী পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে আসছে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরেই চেঙ্গী নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।

গঞ্জপাড়ার বাসিন্দা মো. জুয়েল বলেন, "আমরা পৌর শহরের এত কাছে থেকেও বিচ্ছিন্ন। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়। বিশেষ করে বর্ষার সময় শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে নদী পার হওয়া খুবই কষ্টকর।"

একই এলাকার বাসিন্দা শিখা রানী শীল জানান, সন্তানদের ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শহরে আসতে হয়। কিন্তু নদীতে পানি বাড়লে পারাপার বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, "আমরাও পানিবন্দি হয়ে পড়ি। সন্তানদের আর স্কুল-কলেজে পাঠানো সম্ভব হয় না। দীর্ঘদিন ধরে সেতুর দাবি জানালেও এখনো এই এলাকার বাসিন্দাদের স্থায়ী সমস্যার সমাধান হয়নি।"

স্থানীয় বাসিন্দা আনুমং মারমা অভিযোগ করেন, জন্মের পর থেকেই এলাকার মানুষের এই দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই। তিনি বলেন, "একটি সেতুর অভাবে ঝুঁকি নিয়ে মানুষ ও স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে একটি ইঞ্জিনবিহীন নৌকায় নদী পার হয়। খরস্রোতা চেঙ্গী নদীতে প্রতিবছর পারাপারের সময় কোনো না কোনো দুর্ঘটনার খবর শোনা যায়।" তার মতে, একটি স্থায়ী সেতু হলে জীবনযাত্রা সহজ হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়বে।

সচেতন নাগরিক ও খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য বিষয়টির পরিবেশগত দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অবৈধ পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও বন উজাড়ের কারণে পাহাড়ের মাটি চেঙ্গী নদীতে পড়ে নাব্যতা কমছে। ফলে বর্ষায় গঞ্জপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে মানুষ শহর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, "বিশেষ করে উত্তর গঞ্জপাড়ার মানুষকে বর্ষায় পানিবন্দি এবং শুষ্ক মৌসুমে ঝুঁকি নিয়ে একটি মাত্র নৌকায় স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে গাদাগাদি করে নদী পার হতে হয়। ফলে বছরের কোনো না কোনো সময় দুর্ঘটনার খবর শোনা যায়। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে ওই এলাকায় একটি স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণ করা হলে মানুষের যাতায়াত নিশ্চিত হবে।"

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি পৌর প্রশাসক রুমানা আক্তার জানান, গঞ্জপাড়ার মানুষের দীর্ঘদিনের সমস্যাটি তাদের নজরে এসেছে। তিনি বলেন, "নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। গঞ্জপাড়া এলাকাটি সদর গোলাবাড়ী ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ যেহেতু জেলা পরিষদ দেখে, তাই এ বিষয়ে জেলা পরিষদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

অন্যদিকে, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ম্রাসা থোয়াই মারমা বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করে বলেন, "গঞ্জপাড়ার মানুষের যাতায়াতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়ীভাবে সেতু নির্মাণের মাধ্যমে এই এলাকার মানুষের দুর্ভোগ দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ থাকবে।"