বগুড়ায় সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, "বাধ্য হয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন ও লংমার্চ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।" গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বৈষম্য দূর করা, বেপরোয়া দলীয়করণ বন্ধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সারের সরবরাহ নিশ্চিত করার ছয় দফা দাবিতে এই কর্মসূচি চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের অবহেলা ও অঙ্গীকার ভঙ্গই জনগণকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা পৌনে ১১টার দিকে বগুড়া সার্কিট হাউসে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, "মালয়েশিয়া ও জাপানের মতো দেশ স্বাধীনতার পর অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক উন্নতি করেছে। অথচ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশের অবকাঠামো ও শিল্প খাত প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।"
তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান সংকট তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ ও সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় খাতটির উৎপাদন ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে চলে যাচ্ছেন। সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বিনামূল্যে কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, "দেশকে ভালোবাসার জায়গা থেকে দেশি-বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দল গঠন করে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার সংকট স্বীকার না করে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়েছে।"
বগুড়ার উন্নয়নে সরকারের অবহেলার কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, "বগুড়া হচ্ছে উত্তরবঙ্গের নাভি ও সাত মাথার ঐতিহাসিক সংযোগস্থল। একসময় বগুড়া একটি মিনি শিল্পনগরী ও এডুকেশন ভিলেজ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছরে একটি মেডিকেল কলেজ ছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। শিল্প কারখানাগুলো টিকে থাকেনি।" ধুনট যাওয়ার পথে সড়কের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে তিনি বগুড়ার প্রতি অবহেলার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে মন্তব্য করেন এবং আগের কোনো সরকার বগুড়াকে তার প্রাপ্য উন্নয়ন দেয়নি বলে অভিযোগ করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে বগুড়ার অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকার অঙ্গীকার করে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী সারা দেশ দেখবেন। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দেশের মানুষের অধিকারের চৌকিদারি ও পাহারাদারির দায়িত্ব তার। ভোলা, যশোর, সাতক্ষীরা কিংবা তিস্তা পাড়ের মানুষের অধিকার নিয়ে যেমন সংসদে কথা বলেছেন, তেমনি বগুড়ার ন্যায্য পাওনা নিয়ে রাজপথ ও সংসদে জোরালো দাবি জানাবেন।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য অনুষ্ঠিত গণভোটে ৮২ দশমিক দুই শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় এসে সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। তিনি বলেন, "১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় অমান্য করার পরিণতি শুভ হয়নি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের রায় বাস্তবায়ন করা উচিত।"
সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ। সাংবাদিকরা সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ থাকলে রাষ্ট্রের অন্য বিভাগগুলো সঠিকভাবে চলতে বাধ্য হয়। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশকে সঠিক পথে পরিচালনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বগুড়া মহানগর ও জেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে স্থানীয় সাংবাদিকদের পাশাপাশি জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে, এদিন সকালে ডা. শফিকুর রহমান ধুনট উপজেলায় শহীদ আব্দুল মালেকের কবর জিয়ারত করেন এবং স্থানীয় মানুষের সাথে মতবিনিময় করেন। সার্কিট হাউসের মতবিনিময় সভা শেষে দুপুরে তিনি বগুড়া জেলা ও মহানগর জামায়াতের রুকন সম্মেলনে যোগ দেন।