গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গাজীপুর সাফারি পার্কের বন্য প্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টিন শেডে আটকে আছে দুটি লেপার্ড। তিন সপ্তাহের জন্য রাখার কথা থাকলেও, ২০১৭ সাল থেকে প্রায় নয় বছর ধরে এই ছোট কক্ষেই তাদের জীবন কাটছে। চারদিকে লোহার গ্রিল, গাছে ওঠার কোনো সুযোগ নেই এবং স্বাভাবিকভাবে ছুটে বেড়ানোর বা শিকার করার পরিবেশও তাদের নেই। এমনকি দর্শনার্থীরাও তাদের দেখতে পাচ্ছেন না।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া এলাকা থেকে একটি গাড়িতে করে পাচার হওয়ার সময় পুলিশ দুটি লেপার্ড ও দুটি সিংহশাবক উদ্ধার করে। বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগে দুজনকে আটক করা হয়। পরে চারটি শাবককে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী রোগ সংক্রমণ রোধে তাদের তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে সিংহশাবক দুটিকে সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হলেও লেপার্ড দুটিকে কোয়ারেন্টিন শেডেই রাখা হয়। উদ্ধারের সময় লেপার্ড দুটির বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস; একটির ওজন ছিল ২ কেজি এবং অন্যটির ১ কেজি ৬০০ গ্রাম। লেজসহ তাদের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ২৬ ও ২২ ইঞ্চি ছিল। এখন তাদের বয়স প্রায় ৯ বছর হলেও তাদের জন্য কোনো উপযোগী আবাস তৈরি হয়নি।

বৃহস্পতিবার সকালে পার্কে গিয়ে দেখা যায়, খাবার দেওয়ার সময় একটি কক্ষে তাদের আটকে রাখা হয়। খাবার দেওয়ার পর দরজা খুলে দিলে দুই কক্ষে ঘুরে ঘুরে খাবার খায় তারা। শেডের কাছে মানুষ গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে গ্রিলের ওপর লাফিয়ে ওঠে। কক্ষের জায়গা এতই কম যে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা, লাফানো কিংবা গাছে ওঠার সুযোগ নেই তাদের।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী–বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "নতুন কোনো প্রাণী আনার পর রোগজীবাণু ছড়ানো ঠেকাতে সাধারণত চার সপ্তাহ পর্যন্ত কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। এরপর উপযোগী জায়গায় স্থানান্তর করা উচিত। দীর্ঘদিন কোয়ারেন্টিনে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তাঁর মতে, সাফারি পার্কে প্রাণীদের জন্য তুলনামূলক বড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যবস্থা থাকার কথা। দ্রুত লেপার্ড দুটির জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে সেখানে নেওয়া দরকার।"

২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাফারি পার্ক পরিদর্শনে এসে লেপার্ড দুটির জন্য আবাসন তৈরির পরামর্শ দিয়েছিলেন। এর আগেও উচ্চপর্যায় থেকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে এখনো সেই আবাসন তৈরি হয়নি।

দর্শনার্থী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, "বাঘ ও সিংহ দেখার সুযোগ থাকলেও লেপার্ড দেখার সুযোগ নেই। ব্যবস্থা করা হলে দর্শনার্থীরা এই প্রাণীটিও দেখার সুযোগ পাবেন।"

গাজীপুর সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক ও বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ঢাকার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় লেপার্ড দুটিকে কোয়ারেন্টিন শেডেই রাখা হয়েছে। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি স্থানটি পরিদর্শন করে গেছে। এ বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা করা যায়।"