ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার ৪০ নম্বর বাঁশাটি চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলাধুলার মাঠটি এখন বর্জ্য ও জলাবদ্ধতায় ঢেকে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকা ও আশপাশের খামারের আবর্জনা মিশে মাঠটি শিশুদের জন্য অস্বাস্থ্যকর ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া, সকালের সমাবেশ ও জাতীয় সংগীত গাওয়াকালেও শিশুরা তীব্র দুর্গন্ধে ভুগছেন।

মাঠের নিচু অংশে জমাট বাঁধা কাদা ও ঘোলাটে পানিতে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ভেসে বেড়াচ্ছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ও খামারের আবর্জনা মিলে এই পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়। কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বর্জ্য জমার স্থায়ী কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মধ্যবয়সী বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, খামারগুলোর বর্জ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় তা বৃষ্টির পানি ও অন্যান্য প্রবাহের সঙ্গে বিদ্যালয়ের মাঠের দিকে চলে আসে। মাঠের নিচু অংশে পানি আটকে থাকায় বর্জ্য জমতে থাকে। একসময় সেই পানি দুর্গন্ধযুক্ত ও নোংরা রূপ নেয়। ছোট শিশুদের কেউ কেউ অসাবধানতাবশত ওই নোংরা পানিতে পড়ে যেতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় মশা ও জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায় অভিভাবকদের উদ্বেগ দ্বিগুণ হয়েছে। অভিভাবক সাথী আক্তার ও জহুরা বেগম জানান, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো হয় নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠার জন্য। কিন্তু স্কুলের মাঠের এমন অবস্থা দেখে তাঁরা দুঃচিন্তায় থাকেন। নোংরা পানি ও বর্জ্যের কারণে শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে বলে তাঁদের ভয়। তারা আরও জানান, কোনো খামারের বর্জ্য যদি বিদ্যালয়ের মাঠে এসে জমে, তবে তা আর নির্দিষ্ট কোনো পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা থাকে না। এতে পুরো এলাকার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যালয়ের মতো সংবেদনশীল জায়গার পাশে বর্জ্য জমা আরও বেশি উদ্বেগের।

স্থানীয়রা দ্রুত ও স্থায়ী সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন। আমিনুল ইসলাম নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আমরা চাই উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুধু মাঠ ভরাট কিংবা খামার সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশেই যেন পদক্ষেপ সীমাবদ্ধ না থাকে। পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা, বিদ্যালয় সীমানায় বর্জ্য প্রবেশ বন্ধ করা এবং আশপাশের খামারগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খায়রুল আলম বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বিদ্যালয়ের পাশেই ফিরোজ নামের এক ব্যক্তি গরু ও মুরগির খামার করেছেন। খামার থেকে বের হওয়া মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য বর্জ্য বিদ্যালয়ের সীমানা দিয়ে মাঠে এসে পড়ে এবং জমে থাকা পানির সঙ্গে মিশে যায়। তিনি আরও জানান, বর্জ্যের দুর্গন্ধের কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, অফিসকক্ষে দাপ্তরিক কাজ করা এবং সকালের সমাবেশ পরিচলনা করতেও কষ্ট হয়। বিষয়টি সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সংগঠক লে. কর্নেল (অব.) শাহাব উদ্দিন বিষয়টির সামাজিক ও মানসিক প্রভাব তুলে ধরে বলেন, যে মাঠে শিশুদের দৌড়াদৌড়ি করার কথা, সেখানে তারা এখন নাক চেপে হাঁটে। যে প্রাঙ্গণে সকালের সমাবেশে নির্মল বাতাসে জাতীয় সংগীত গাওয়ার কথা, সেখানে দুর্গন্ধ শিশুদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। যে বিদ্যালয় শিশুদের পরিচ্ছন্নতা ও সুস্থতার শিক্ষা দেয়, তার পাশেই যদি মুরগির বিষ্ঠা ও দূষিত পানি জমে থাকে, তবে সেটি কেবল একটি মাঠের দুরবস্থা নয়—আমরা শিশুদের জন্য কেমন পরিবেশ তৈরি করছি, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরে।

এ বিষয়ে মুক্তাগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কৃষ্ণচন্দ্র সমাধানমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাঠের যে অংশে পানি জমে থাকে, সেখানে মাটি ভরাট করে ফুলের বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মুরগির খামারের মালিকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং খামারটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাঠটি দ্রুত পরিষ্কারের পাশাপাশি বর্জ্য প্রবেশের পথ বন্ধ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা জোরদার না করলে বর্ষায় সমস্যাটি পুনরায় ফিরে আসবে। শিশুদের সুস্থ ও নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন স্থানীয়রা।