জাপানের শিশুদের মধ্যে বাড়ি ফিরেই গরগরা করার একটি বিশেষ রীতি প্রচলিত আছে, যাকে বলা হয় ‘উগাই’। সুস্থ থাকার লক্ষ্যেই এই চর্চা করা হয়। তবে এই রীতির মাধ্যমে আদতে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মত জানাল ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার এবং মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশুবিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. তাসনুভা খান। রাফিয়া আলমের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে গরগরা করলে মুখ ও গলার ভেতরের ময়লা সাময়িকভাবে হ্রাস পায়। পানি ফেলার সময় কিছু অণুজীব, খাদ্যকণা ও ধুলা-বালি বেরিয়ে যায়, ফলে জীবাণুর পরিমাণ কিছুটা কমতে পারে। তবে এর ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি সরাসরি কমে যায়—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। বাইরে থেকে ফেরার পর গরগরা করা বা কুলি করা একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, যা মুখের দুর্গন্ধও কমায়। কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, উগাই রীতির ফলে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা কম হতে পারে, তবে এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো সীমিত এবং সব গবেষণার ফলাফল এক নয়।
উল্লেখ্য, উগাই সরাসরি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আশির দশকের ‘হাইজিন হাইপোথিসিস’ এবং বর্তমানের আধুনিক ‘ওল্ড ফ্রেন্ডস হাইপোথিসিস’ অনুযায়ী, শৈশবে প্রাকৃতিক পরিবেশ, মাটি ও প্রাণীর সংস্পর্শে আসা শিশুদের অ্যালার্জি এবং ইমিউন মেডিয়েটেড রোগের ঝুঁকি কম হয়। ইমিউন মেডিয়েটেড রোগ মূলত রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে হয়। তবে এই হাইপোথিসিসগুলো সংক্রমণ প্রতিরোধের বিপক্ষে নয়। সাধারণ পানি দিয়ে গরগরা করলে মুখের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হয় না, তবে ঘন ঘন জীবাণুনাশক দ্রবণ ব্যবহার করা উচিত নয়।
সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে শৈশব থেকেই কিছু মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি। যেমন—বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, অপরিষ্কার হাত দিয়ে নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ না করা এবং শৌচকর্মের আগে-পরে সাবান ব্যবহার করা। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে অপরিষ্কার হাতে শৌচকর্ম করলে প্রস্রাবে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া সুষম পুষ্টি, পর্যাপ্ত ঘুম, সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং শাকসবজি ও ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া প্রয়োজন। শ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায় এমন রোগের প্রাদুর্ভাবে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অভ্যাসের পাশাপাশি উগাই চর্চাও করা যেতে পারে। তবে বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে জীবাণুনাশক দ্রবণের বদলে সাধারণ পানি বা লবণ পানি ব্যবহার করা শ্রেয়। পাশাপাশি শিশুদের সুস্থ প্রাণীর সংস্পর্শে রাখা এবং খোলা মাঠে আলো-বাতাসে দৌড়ঝাঁপ করার সুযোগ করে দেওয়া তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক হয়। ঘরের মেঝে সব সময় জীবাণুমুক্ত দ্রবণ দিয়ে মোছার প্রয়োজন নেই, বরং স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠাই শিশুর জন্য বেশি উপকারী।