সরকার একের পর এক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় বিজয়নগরের বিজয়-৭১ চত্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল সংসদে পাসের প্রতিবাদে এবং সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে এসব কথা বলেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।

এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদীউজ্জামান খোকনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মজিবুর রহমান মঞ্জু। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, আমিনুল ইসলাম এফসিএ, আলতাফ হোসেন ও শাহাদাতুল্লাহ টুটুল।

গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার আইন প্রসঙ্গে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, "গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের কাছে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তা পূরণ করা হয়নি। বরং আগের অধ্যাদেশ বাতিল করে আরও শক্তিশালী আইন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত দুর্বল আইন করা হয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, "গুমের অভিযোগের তদন্ত যদি সেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা পুলিশের হাতেই থাকে, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠছে, তাহলে সেটি নিছক প্রহসন। গুমের তদন্ত এমন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দিতে হবে, যার কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি বা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের চাপের ভয় থাকবে না। অতীতে গুমের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কখনো স্বতঃস্ফূর্তভাবে গুমের দায় স্বীকার করেনি। তাই গুমের তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য।"

সরকারের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে তিনি বলেন, "আপনারা আমাদের উন্নত আইন দেওয়ার কথা বলে ধোঁকা দিয়েছেন। একের পর এক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছেন। মনে রাখবেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, আগামী দিনে তারাও ক্ষমতার বাইরে যেতে পারেন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার নিয়ে করা এই আইন একদিন আপনাদের জন্যই বুমেরাং হবে।"

অন্যান্য প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেড় বছরে এক কোটি কর্মসংস্থানের কথা বলা হলেও তা এখন ভুলে যাওয়া হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে না বলা সত্ত্বেও কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি, তবে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়িয়ে জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানো হয়েছে।

ইরানের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে তা স্বীকার করে তিনি প্রশ্ন করেন, "কিন্তু চাঁদাবাজি বেড়ে যাওয়ার জন্যও কি ইরানের যুদ্ধ দায়ী? আপনারা সেই অতীতের পথেই হাঁটছেন।"

সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন বিল প্রসঙ্গে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, নতুন আইনে ভবিষ্যতে নানা জটিলতা ও বিরোধ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দানকৃত সম্পত্তি পরবর্তীতে বিক্রি বা হস্তান্তরের সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, "বাবা-মা বা কোনো দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করলেও তাদের ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য মানবিক। কিন্তু এই আইনের কোনো বিধান মুসলিম আইন বা শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।"

তিনি দাবি জানান, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন আইন—এই তিনটি আইন পুনর্বিবেচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, "নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের ভোটে সংসদে গিয়ে যারা ধানক্ষেতে, পাটক্ষেতে ঘুমানোর ইতিহাস দেখেছেন, তারা আজ সেই ইতিহাস ভুলে গেছেন।"

তিনি আরও বলেন, "জিয়া পরিবারের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস ভুলে গেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার ইতিহাস ভুলে গেছেন। হাজার হাজার মানুষকে গুম, গুলি ও ক্রসফায়ারের সেই ইতিহাসও ভুলে গেছেন।"

ফুয়াদের মতে, আজ সেই ইতিহাস দেখতে হচ্ছে সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে। অথচ সংসদে দাঁড়িয়ে আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতির সঙ্গে ছলচাতুরি শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, "২০০৯ সালের মানবাধিকার কমিশন আইনকে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আইন যদি ফিরিয়ে আনতেই হয়, তাহলে আওয়ামী লীগকেও ফিরিয়ে নিয়ে আসুন! এই সংসদ অক্ষরে অক্ষরে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার সব কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। তারা ৩১ দফার সঙ্গে বেঈমানি করেছে এবং লাখ লাখ জাতীয়তাবাদী শক্তির সঙ্গে প্রতারণা করেছে।"

সতর্ক করে তিনি বলেন, "ভুলে যাবেন না, আবারও মুচলেকা দিতে হতে পারে।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় মানুষের হৃদয়ে এবং দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হয়ে গেছে, যা কয়েকটি কলমের খোঁচায় বাতিল করা যাবে না।

সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়কক সেলিম খান, ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর, ছাত্রপক্ষের সাধারণ সম্পাদক রাফিউর রহমান ফাত্তাহ, ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক রাজিয়া সুলতানা, কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশার, মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা) শাজাহান ব্যাপারী, গাজীপুর মহানগরের সদস্যসচিব মাসুদ জমাদ্দার রানা এবং নারী উন্নয়নবিষয়ক সহসম্পাদক শাহিনুর আক্তার শিলা।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক আব্দুর রব জামিল, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, রিপন মাহমুদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, সহদপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানবিষয়ক সহসম্পাদক সুমাইয়া শারমিন ফারহানা, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব রাশিদা আক্তার মিতু, মিজানুর রহমান মিঠু, যুব পার্টির মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়কক মাসুদুর রহমান, সদস্যসচিব শরীফ হোসেন, রমনা থানার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মুন্সী এবং যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক মিয়া সুলতান আরিফ।