ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের ‘বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী’ জয়নুল গ্যালারিতে শিল্পী কান্তিদেব অধিকারীর তত্ত্বাবধানে ২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে আজ সমাপ্ত হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী মিনিয়েচার ও বেঙ্গল স্কুলের শৈলীকে সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিশিয়ে নতুন শিল্পভাষা নির্মাণের যে প্রয়াস এই প্রদর্শনীতে ফুটে উঠেছে, তা কেবল প্রযুক্তির অনুকরণ নয়; বরং এটি বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও আধুনিক চেতনার এক সক্রিয় সংলাপ।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই প্রাচ্যকলা বিভাগের ভিত্তি স্থাপিত হয়। পঞ্চাশের দশকে ইউরোপ ভ্রমণের পরও তিনি দেশীয় শিল্প-ঐতিহ্যের শিকড় থেকে বিচ্যুত হননি; বরং আধুনিক অভিজ্ঞতাকে স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করে গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউটে প্রাচ্যকলা বিভাগ চালু করেন। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন চিত্রশৈলী, মিনিয়েচার ও লোকশিল্পের চর্চার মাধ্যমে তিনি যে ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন, তারই ধারাবাহিক প্রতিফলন আজকের শিক্ষার্থীদের কাজে দেখা যাচ্ছে। পাশ্চাত্য শিল্পতত্ত্বের আলোকে বেঙ্গল স্কুলকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা থাকলেও এর অন্তর্নিহিত স্বদেশচেতনা, দেশীয় শিল্প–ঐতিহ্যের সন্ধান এবং নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এই প্রদর্শনীতে শিক্ষার্থী শিল্পীরা সহজাত ও লোকজ ভাবধারাকে আধুনিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে নিজস্ব রূপরেখা তৈরি করেছেন। সুষমা সাদাফ মিথীর ‘জয়নুল উৎসব’ চিত্রকর্মে পাখির চোখে দেখা চারুকলার উৎসবকে ক্যানভাসে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা যান্ত্রিক আলোকচিত্রের পুনর্নির্মাণ নয়; বরং শিল্পীর কল্পনা ও দৃষ্টির মধ্য দিয়ে গাছপালা, স্থাপত্য ও মানুষের সমাবেশ নতুন এক দৃশ্যভাষা পেয়েছে। জাহিন রাঈদা মাইশার ল্যান্ডস্কেপে মানুষ ও প্রকৃতির চিরন্তন সহাবস্থান এক দরদি অনুভব নিয়ে ফুটে উঠেছে। সাধারণ দৃশ্যের গণ্ডি পেরিয়ে এই শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী মিনিয়েচার রীতির সঙ্গে সমকালীন জীবনবোধের মেলবন্ধন ঘটান। ফলে প্রাচ্যধারায় নির্মিত ল্যান্ডস্কেপ কেবল প্রকৃতির দৃশ্য হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে বাংলার মাটি, মানুষ ও সাংস্কৃতিক সত্তার এক নান্দনিক পাঠ।

প্রাচ্যকলা বিভাগের চিত্রচর্চায় জলরঙের ধৌত পদ্ধতির একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সেজুতি মেরেলিন পেরেরা, শুভজিৎ পাল, বাপ্পী পাল, মীর মুজনাবিন আহমেদ আপন, প্রগতি চাকমা প্রমুখ শিল্পীর ধৌত পদ্ধতির কাজে রঙের লাবণ্য, স্বচ্ছতা ও স্তরবিন্যাসের সঙ্গে প্রাচ্য ষড়ঙ্গের (রূপভেদ, প্রমাণ, ভাব, লাবণ্যযোজন, সাদৃশ্য ও বর্ণিকাভঙ্গ) গুণাবলি মিলিত হয়ে চিত্রমালায় স্বতন্ত্র আবহ তৈরি করেছে। পাশাপাশি গোয়াশ, টেম্পারাসহ নানা মাধ্যমে উদীয়মান শিল্পীদের অনুশীলনধর্মী কাজও রয়েছে। এসব কাজের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, এখানে পঠনপাঠন কেবল কোনো নির্দিষ্ট রীতির অনুকরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রীতি, কৌশল ও নিজস্ব সৃজনশীলতার মধ্যে একটি ক্রমাগত অনুসন্ধান চলছে।

পরম্পরা ও ঐতিহ্যের সূত্র যেমন এসব শিল্পীর কাজে প্রবহমান, তেমনি তার সঙ্গে মিশে আছে আধুনিক সৃজনশীলতার নিজস্ব ভঙ্গি। অনন্যা হালদার, নকীব জাহাঙ্গীর, বসুন্ধরা সরকার, বাদশা হারুন নুর রশীদ, সুদীপ্ত বসাক অর্ণব প্রমুখের কাজে ঐতিহ্য নিছক অতীতের পুনরাবৃত্তি হয়ে থাকেনি; সমকালীন সংবেদন ও ব্যক্তিসত্তার স্পর্শে তা পেয়েছে নতুন ব্যঞ্জনা। আর সেই সূত্র ধরেই শিল্পের অন্তর্জগতে প্রবেশ করেছে মনস্তত্ত্বের অনুষঙ্গ। রাহেলী রুবাইয়াতের সূক্ষ্ম মিনিয়েচারধর্মী কম্পোজিশনে রঙের দ্যোতনা ও প্রতীকের অর্থবহ ব্যবহার দর্শককে দৃশ্যমান বাস্তবতার আড়ালের এক অন্তর্লোকে নিয়ে যায়। তাঁর ছবিতে অবচেতন মনস্তত্ত্ব, স্মৃতি ও সাম্প্রতিক ভাবনার নানা স্তর যেন পরস্পরের সঙ্গে নিঃশব্দে সংলাপ করে। অন্যদিকে প্রাচ্যরীতির সহজাত সারল্য যেখানে রূপচেতনার অন্যতম ভিত্তি, সেখানে পল্লবী বিশ্বাসের কাজ যোগ করেছে এক অনন্য মাত্রা। তাঁর ক্যানভাসে হলুদের দীপ্ত পরিসরে সোনালি ফুল ও নারীর অবয়বের মেলবন্ধন রচনা করে এক রূপাতীত সৌন্দর্য, যেখানে লৌকিকতা ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিকতার দিকে উন্মোচিত হয়।

এই চিত্রমালায় বাংলার এবং ভারতীয় উপমহাদেশের লোকশিল্প, ঐতিহ্য ও পৌরাণিক অনুষঙ্গও নানা রূপে ফিরে এসেছে। গ্রামীণ জীবনযাত্রার সহজ-সরল রূপ, তাঁতশিল্পের মতো প্রথাগত পেশা, উৎসব-অনুষ্ঠানের আনন্দঘন মুহূর্তের পাশাপাশি রাসলীলা, শাস্ত্রীয় চিত্রায়ণ ও পদ্মাসনে দেবীরূপের উপস্থিতি ছবিগুলোকে দিয়েছে পৌরাণিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির গভীরতা। বেঙ্গল স্কুল ও ঐতিহ্যবাহী মিনিয়েচার পেইন্টিংয়ের প্রভাবের সঙ্গে ওয়াশের নরম শেড, জলরঙের মোলায়েম ব্যবহার এবং লাল, নীল ও হলুদের সুষম বৈপরীত্য মিলে তৈরি করেছে স্বপ্নীল ও আবেগময় এক চিত্রভাষা।

সব মিলিয়ে এই চিত্রমালা ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যাওয়ার নিছক নস্টালজিয়া নয়; বরং ঐতিহ্যকে বর্তমানের চোখে পুনরায় পাঠ করার একটি সৃজনশীল প্রয়াস। এখানে প্রাচ্যরীতি অতীতের অনুকরণ নয়, শিকড় থেকে সমকালীন আত্মপরিচয় নির্মাণের একটি সক্রিয় শিল্পভাষা। দৃশ্যমান সৌন্দর্যের আড়ালে তাই এসব ছবি আমাদের নিয়ে যায় ইতিহাস, লোকস্মৃতি, পৌরাণিক কল্পনা, মনস্তত্ত্ব ও সমকালীন জীবনের বহুমাত্রিক জগতে। এ কারণেই প্রদর্শনীটি কেবল কিছু শিল্পকর্মের সমাবেশ নয়; বরং শিকড়ের সঙ্গে বর্তমানের এক নান্দনিক সংলাপ।