‘প্রতিটি ছবির সামনে দাঁড়ালে চোখ কিছুক্ষণ থমকে থাকে। একবার দেখে চলে যাওয়ার মতো নয় ছবিগুলো ধীরে ধীরে পাঠ করতে হয়। লাবণ্যময় রং-রেখা, সংযত বিন্যাস ও সূক্ষ্ম বিবরণ মিলে তৈরি করে এক মায়াবী আবেশ। বাংলার লোকশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য, প্রাচ্যচিত্রের উত্তরাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভাববৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার এই চিত্রমালার দৃশ্যভাষায় প্রবহমান।’

একটি চিত্র প্রদর্শনীর পর্যালোচনার শুরুটা ছিল ঠিক এমন। প্রদর্শনীটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের ‘বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী’। গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মুক্তকণ্ঠের ‘অন্য আলো’র অনলাইন সংস্করণে ‘শিল্পভাষায় আত্মপরিচয় নির্মাণ’ শিরোনামে এই রিভিউটি লিখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষক মলয় বালা।

এই লেখাটিকে একটি কেস স্টাডি হিসেবে ধরে বিশ্লেষণ করলে আমরা মূল সংকটের গভীরে প্রবেশ করতে পারি। পর্যালোচনার চারটি বাক্যের কোনোটিতেই উল্লেখ নেই যে এটি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রদর্শনীর কথা বলছে। বর্তমান সময়ে দেশীয় চিত্রকলা প্রদর্শনীর রিভিউগুলো যে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে তৈরি হচ্ছে, এই লেখাটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বৈচিত্র্যের অভাব হয়তো বড় কথা নয়, কিন্তু এখানে যে দাবি করা হচ্ছে তা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কতটা যৌক্তিক? সমালোচক এখানে দাবি করেছেন, ‘বাংলার লোকশিল্পকে দীর্ঘ ঐতিহ্য, প্রাচ্যচিত্রের উত্তরাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভাববৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার এই চিত্রমালার দৃশ্যভাষায় প্রবহমান।’ প্রশ্ন জাগে, বাংলার চিত্রকলা কি সত্যিই প্রাচ্যচিত্রের উত্তরাধিকার? এটি কি সত্যিই লোকশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ?

এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যতত্ত্ব আমাদের এই প্রশ্নটিই করতে শেখায়। এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বাইরে প্রাচ্যকে বড় পরিসরে নতুন করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা খুব কমই হয়েছে। ইউরোপীয় সমালোচকরা এই তত্ত্বের কিছু অংশের সমালোচনা করলেও সম্পূর্ণ ধারণাটি খারিজ করতে পারেননি। ফলে আমাদের এই তত্ত্বটিকেই শেষ কথা হিসেবে ধরে নিতে হচ্ছে।

আসলে প্রাচ্যচিত্র কী? এই ধারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে কি? প্রাচ্যে প্রায় ৩৬টি দেশ রয়েছে। এই ৩৬টি দেশ কি কখনো মিলে একটি একক শিল্পরীতি তৈরি করেছে? প্রাচ্যের মিসরীয় শিল্পরীতির সঙ্গে বঙ্গীয় শিল্পরীতির কি কোনো মিল আছে? আরব, চীন বা জাপানের চিত্রকলার সঙ্গে আমাদের চিত্রকলার কোনো সম্পর্ক আছে কি? যদি থাকে, তবে তা কবে থেকে শুরু হলো? মূলত ওরিয়েন্টাল বা প্রাচ্যকলার ধারণাটি আসার পর থেকেই আমরা এই মিল খুঁজে পেতে শুরু করি। এই ধারণাটি সাংস্কৃতিক কারণে যতটা না তৈরি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক কারণে। আমরা জানি, পশ্চিমারা তাদের শাসনের প্রয়োজনে প্রাচ্যকে এভাবে বিভক্ত করেছে। এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যতত্ত্বও আমাদের ঠিক এই কথাটিই বলে। এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বাইরে প্রাচ্যকে কেউ এখনো বড় আকারে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। এটাই সর্বশেষ হিসেবে ধরে নিতে হচ্ছে আমাদের। ইউরোপীয় সমালোচকেরা এই তত্ত্বের কিছু জায়গা সমালোচনা করলেও, সম্পূর্ণ ধারণাটি খারিজ করে দিতে পারেনি।

সমালোচক বাংলার চিত্রকলাকে প্রাচ্যচিত্রের উত্তরাধিকার বলার পেছনে একটি যুক্তি দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভাববৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার এই চিত্রমালার দৃশ্যভাষায় প্রবহমান।’ তবে এই ধারার পূর্বসূরি কারা? লেখক মলয় বালা নিজেই তার রিভিউতে এর উত্তর দিয়েছেন: ‘এই শিল্পভাবনার ঐতিহাসিক শিকড় খুঁজতে গেলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কথা অনিবার্যভাবেই সামনে আসে। তাঁর শিল্পচেতনার গভীরে ছিল দেশ, মাটি, মানুষ ও প্রাচ্য সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ। পঞ্চাশের দশকে ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পদৃষ্টিতে নতুন মাত্রা যোগ করলেও তিনি দেশীয় শিল্প–ঐতিহ্যের শিকড়ের সন্ধান থেকে বিচ্যুত হননি। বরং আধুনিক শিল্প-অভিজ্ঞতাকে দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াসে তাঁর আগ্রহ ও উদ্যোগে তৎকালীন গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউটে প্রাচ্যকলা বিভাগের সূচনা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন চিত্র–ঐতিহ্য, বেঙ্গল স্কুল, মিনিয়েচার ও লোকশিল্পের চর্চার মধ্য দিয়ে দেশীয় শিল্পভাষার বিকাশের যে ভিত্তি তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তারই একটি ধারাবাহিক প্রতিফলন আজকের এই চিত্রচর্চায় দেখা যায়।’

এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জয়নুল আবেদিন পূর্বসূরি হলেও সামগ্রিক ভারতবর্ষে এই ধারার প্রবর্তক ছিলেন নন্দলাল বসু, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং যামিনী রায়ের মতো শিল্পবোদ্ধারা। তাঁদের ‘বেঙ্গল স্কুল’ ধারণাই মূলত এখানে প্রাচ্যকলার ভিত্তি তৈরি করে। তাঁরাই এই প্রাচ্যকলাকে বেঙ্গল স্কুল হিসেবে পরিচিত করতে শুরু করেন। লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা’ নামে আলাদা কোনো বিভাগ নেই। ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগটি ‘প্রাচ্যকলা’ নামেই পরিচিত। অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা’ বা ‘প্রাচ্যকলা বিভাগ’ নেই। উত্তর-ঔপনিবেশিক এই সময়ে এসে আমাদের পূর্বসূরি শিল্পবোদ্ধাদের এই সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, কারণ প্রাচ্যকলা ধারণাটিই একটি সদ্য আরোপিত ধারণা, যার বয়স বড়জোর তিনশ বছর।

এই বিভাগের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে বিভাগের শিক্ষক দীপ্তি রানী দত্ত তাঁর ‘প্রাচ্যকলা বিভাগ: প্রতিষ্ঠাকালীন বাস্তবতা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘জয়নুল আবেদিন ১৯৩৩ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। দেশভাগের কারণে ১৯৪৮ সালে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত জয়নুল কলকাতা আর্ট স্কুল ত্যাগ করেন ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে। ১৯৪৮ সালেই তিনি তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। জয়নুল যে শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন, তার শিক্ষাপদ্ধতি কলকাতা আর্ট স্কুলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। সম্ভবত ওই শিক্ষাপদ্ধতিকে অনুসরণ করেই জয়নুল ১৯৫৫ সালে নতুন আরেকটি বিভাগ—প্রাচ্যকলা শুরু করেছিলেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও চারুশিল্পের সম্পাদক নজরুল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, তিনি যখন কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন, তখন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ভারতীয় তথা ওরিয়েন্টাল আর্টকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলন চলছিল, তা সত্ত্বেও তিনি কেন ইউরোপীয় চিত্রাঙ্কন পদ্ধতি বেছে নিলেন?

জবাবে শিল্পাচার্য বলেছিলেন, “আসলে মুকুল দে–ও আমাকে ওরিয়েন্টাল আর্টেই যেতে উপদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার মারাত্মক দুর্বলতা ছিল ইউরোপীয় চিত্রাঙ্কন রীতির প্রতি। আমি ছোটবেলা থেকেই নিসর্গ থেকে ছবি এঁকেছি। সেই আঁকার রীতি আমার নিজস্ব এবং বস্তুত ইউরোপিয়ান একাডেমিক পদ্ধতির। মনে হতো, ওভাবেই প্রকৃতির দৃশ্যাবলি, গাছপালা, নদী ইত্যাদি আমি ঠিকভাবে দেখাতে পারব। ওরিয়েন্টাল রীতি তো বেশ স্টাইলাইজ, তাতে যেন তৃপ্তি পেতাম না।” (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ৩৯তম সংখ্যা, ১৫ মার্চ ১৯৭৪)

এখনো বাংলাদেশের কোথাও ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা’ নামে আলাদা কোনো বিভাগ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগ প্রাচ্যকলা নামেই রয়েছে। অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা’ বা ‘প্রাচ্যকলা বিভাগ’ নেই। আমাদের যেসব পূর্বসূরি শিল্পবোদ্ধারা এই বিভাগ খুলেছেন, তা এই উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে এসে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কারণ, প্রাচ্যকলা ধারণাটিই সদ্য আরোপিত একটি ধারণা। যে ধারণার বয়স সাকল্যে তিন শ বছর।

স্বয়ং শিল্পাচার্য যখন তাঁর ইউরেসেন্ট্রিক মানসিকতার কথা প্রকাশ করছেন, তখন কি আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত নয়? তৎকালীন পরিস্থিতিতে তিনি আমাদের যতটুকু সম্ভব এগিয়ে দিয়েছেন এবং শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক পথ খুলে দিয়েছেন। তবে এই সময়ে এসে যদি আমরা পূর্বসূরিদের কাজের পুনর্মূল্যায়ন না করি, তবে তা হবে তাদের প্রতি অবিচার। কারণ তাঁরা এই প্রাচ্যকলা ধারণাটি তৈরি করেছিলেন কোনো না কোনো পূর্বধারণাকে ভেঙে। অনেকগুলো দেশের একটি সমন্বিত সংস্কৃতি বাস্তবসম্মত কি না, তা কেবল প্রশ্নসাপেক্ষই নয়, বরং এই চিন্তা করাটা বর্তমান সময়ে অপরাধের শামিল। বাংলাদেশে আমরা যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে আদিবাসীদেরও এক ছাতার নিচে আনতে চাই, তা এই ধরনের একটি অপরাধ। বহুজাতিক রাষ্ট্রের একক সংস্কৃতির ধারণাটি যদি সঠিক হতো, তবে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হতো না।

প্রাচ্যকলা বা প্রাচ্যচিত্রের এই ধারণা চারুকলার শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে অনুধাবন করেন এবং এর ফলে হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। পশ্চিমারা আমাদের মধ্যে এই হীনম্মন্যতা তৈরি করতে চেয়েছিল এবং তারা তাতে সফলও হয়েছে। আমাদের অধিকাংশ চিত্রশিল্পীই সব সময় বিদেশমুখী এবং দেশীয় মাধ্যমে ছবি আঁকতে আর পছন্দ করেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষক মো. রকিবুল হাসান সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চারুকলা অনুষদে ‘পেইন্টিং’ বা পশ্চিমা তৈলচিত্রকে বানানো হয়েছে ‘আধুনিকতা’র প্রতীক। আর আমাদের নিজস্ব মাটি ও রীতির ‘প্রাচ্যকলা’ (Oriental Art)-কে কেবল ব্যাকডেটেড বা অতীতমুখী ঐতিহ্য বানিয়ে এক পাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে।

এটি কি কেবলই অনিচ্ছাকৃত, নাকি কোনো সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চক্রান্ত? আমাদের মনস্তত্ত্বকে পরাধীন করে রাখার ফলে শিক্ষার্থীরা আজ নিজেদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগছে। নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলে পশ্চিমা ফ্রেমে বন্দী করার এই ষড়যন্ত্র ভাঙার সময় এসেছে। চারুকলা সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পকলা থেকে ঔপনিবেশিক আধিপত্য দূর করে বাংলার নিজস্ব শিল্পভাষাকে মুক্তি দিতে হবে।

মলয় বালার রিভিউতে উল্লিখিত ‘বাংলার লোকশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য’ ধারণাটি যে একটি গোলকধাঁধা, তার উত্তর পাওয়া যায় গবেষক ড. দ্রাবিড় সৈকতের কাজে। ‘বাঙলার চিত্রকলা : ইউরোপমুখীতার মর্মভেদ’ বইয়ে তিনি বুঝিয়েছেন, আমরা যে চিত্রকলাগুলোকে সামনে আনছি তা মূলত লোকশিল্প। লেখকের মতে, এই জীর্ণ আদিপ্রকরণের শিল্প কখনোই বাঙালির প্রকৃত শিল্প ছিল না। বাঙালির চিত্রকলায় যথেষ্ট গাণিতিক ফর্মুলা রয়েছে, যা একটি উন্নত সাংস্কৃতিক পথ রচনা করতে সক্ষম। তিনি কেবল পথ দেখাননি, বরং বঙ্গীয় শিল্পের রীতি, ব্যাকরণ ও গাণিতিক ফর্মুলা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা: দেহতত্ত্বের দার্শনিক উত্তরাধিকার’ বইটি পড়লে এই ধারণা আরও স্পষ্ট হবে।

বাংলা চিত্রকলার ব্যাকরণ কবে, কেন এবং কীভাবে হারিয়ে গেল—এই উত্তর খোঁজা এখন সময়ের দাবি। এই ব্যাকরণ খুঁজতে হলে কেবল বাৎসায়ন, বরাহমিহির, নগ্নজিৎ, সমরাঙ্গন সূত্রধার বা সরস্বতী কুমার পালের গাণিতিক ফর্মুলা ও নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্য অনুসরণ করলেই হবে না, কারণ এগুলো বাংলার দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলা-বঙ্গের দর্শনের প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে যে বিতর্ক, তার অবসান কীভাবে হবে?

ভারতীয় উপমহাদেশে মনীষীদের প্রণীত বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’, বরাহমিহিরের ‘বৃহৎ সংহিতা’, নগ্নজিৎের ‘চিত্রলক্ষণ’, ভোজদেবের ‘সমরাঙ্গন সূত্রধার’ কিংবা সরস্বতী কুমারের পাল ‘চিত্রকলা’র মতো সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ফর্মুলা ও দেহতাত্ত্বিক নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্য থাকার পরও আমরা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিক আধুনিকতার প্রভাবে প্রভাবিত। তার প্রমাণ স্বয়ং চারুকলা নামটি। চারুকলা মানেই কি শিল্পকলা? শিল্পকলা মানেই কি চারুকলা? এই দুটি কি এক শব্দ? প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা কি কখনো এর ব্যবচ্ছেদ করেছি? আমরা জানি চারু মানে সুন্দর এবং কলা মানে বিদ্যা। তবে সূচিশিল্প বা ব্র্যান্ডের পোশাকগুলো কি শিল্প? এগুলো বড়জোর নান্দনিক হতে পারে, শিল্প নয়। শিল্পের সংজ্ঞা পড়লেই তা বোঝা যাবে। চারুকলায় কি চারুচর্চা প্রাধান্য পাবে নাকি শিল্পচর্চা? আমরা চারুশিল্প এবং শিল্পকলাকে গুলিয়ে ফেলেছি। যা জাদুঘরে বা গ্রামীণ ঐতিহ্য বিভাগে থাকার কথা, তা দখল করেছে শিল্পকলার স্থান। কারুশিল্পের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে আমরা এক রেখায় দেখছি।

বাংলা চিত্রকলার ব্যাকরণ কবে থেকে থেকে হারিয়ে গেল? কেন হারিয়ে গেল? কীভাবে হারিয়ে গেল? এই উত্তরগুলো খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। এই ব্যাকরণ খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল বাৎসায়ন, বরাহমিহির, নগ্নজিৎ, সমরাঙ্গন সূত্রধার, সরস্বতী কুমার পালের গাণিতিক ফর্মুলা ও নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্য অনুসরণ করলেই হচ্ছে না। কারণ, এগুলো সব কটিই বাংলার দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলা-বঙ্গের দর্শন আসলে কী? এর প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে যে বিতর্ক, তার অবসান কীভাবে হবে?

দ্রাবিড় সৈকত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন। তাঁর ‘ফ্রয়েডীয় লিবিডো তত্ত্ব এবং তান্ত্রিক দেহাত্মবাদ’ বইয়ে বাংলার দর্শনের একটি রূপরেখা পাওয়া যাবে। বইটিতে বলা হয়, ‘প্রথানুসারে ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায় নয়টি (চার্বাক, বৌদ্ধ, জৈন, সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা, বেদান্ত) ধারায় বিভক্ত। সাধারণত তান্ত্রিক মতাদর্শকে আলাদা করে দার্শনিক সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা যাবে ভারতীয় দর্শনধারায় তন্ত্রই হবার কথা ছিল প্রথম দার্শনিক সম্প্রদায়। কেন তন্ত্রকে আলাদা করে দর্শনপ্রস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না, সেটি বিস্তারিত আলোচনার বিষয় হতে পারে।’ এই বইটি আমাদের চিত্রকলার দর্শন খোঁজার একটি আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বাংলাদেশে এখন সংস্কারের হাওয়া। চারুকলা যদি এই সময়ে সংস্কার না হয়, তবে আর হবে কখন? প্রচলিত একাডেমিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং ‘প্রাচ্যকলা’ বা ‘ফোক’ শব্দাবলির রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক সমালোচনার কারণে প্রতিষ্ঠানের প্রবীণ শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া বা অসহযোগিতা আসা স্বাভাবিক। তবে তাই বলে শিল্পীরা দেশীয় শিল্পের ব্যাকরণ খুঁজবে না বা চারুকলার সংস্কার করবে না, তা মেনে নেওয়া যায় না। কারণ, এ দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে চারুকলার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের একটি লেখার মাধ্যমে শেষ করা যায়, ‘আমাদের এ ধরনের শিল্পীদের অধিকাংশই কিছুটা অপরিণত বয়সে বিদেশে গিয়েছিল এবং গিয়ে সেখানে যেসব চিত্রাঙ্কন ধারা দেখেছে, তাতে তাদের চোখ আটকে গিয়েছিল এবং সেই সব ধারাকে অনুসরণ করে তারা ছবি এঁকেছে, ভালো ছবিও এঁকেছে, কিন্তু আমার মনে হয় ওরা যতই পরিণত হবে, ততই আবার প্রকৃতিতে, জীবনে, জনতায় ও স্বপরিবেশের মধ্যে ফিরে আসবে। নিজ ঐতিহ্য ও নিজ জনমানুষকে তারা জানতে পারবে এবং তাদের চিত্রকলায় তা ফুটাতেও পারবে।’

— অনার্য মুর্শিদ
গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা