গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন ২০২৬ বাতিলের দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। আজ সোমবার বিকেলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে আয়োজিত এই কর্মসূচি শেষে দলটির সদস্যরা কাকরাইল মোড় পর্যন্ত একটি মিছিল বের করেন।
১৮৮২ সালের ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি অ্যামেন্ডমেন্ট বিলের আধুনিক রূপ হিসেবে পাস হওয়া এই আইনে বলা হয়েছে, সম্পত্তি দানের পর দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। একইভাবে দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতা মৃত্যুবরণ করলে আইন অনুযায়ী সম্পত্তি তার ওয়ারিশদের কাছে স্থানান্তরিত হবে। বিলটি পাসের সময় বিরোধী দলসহ জামায়াতের সংসদ সদস্যরা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, সামাজিক সমস্যার নামে ইসলামি বিধান পাশ কাটাচ্ছে সরকার এবং এতে উত্তরাধিকারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিল পাসের সময় বলেছিলেন, নতুন বিধান হেবা বা অন্য কোনো মুসলিম সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতিতে প্রভাব ফেলবে না। তবে কণ্ঠভোটে বিলটি সংসদে পাস হয়।
সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “এই আইন প্রত্যাহার না করলে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে।” তিনি শুধু দলের নয়, বরং দেশের আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থী মানুষের মতামতের ভিত্তিতে সরকারকে আইনটি পর্যালোচনার আহ্বান জানান।
“সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের মাধ্যমে সরকার কোরআন-সুন্নাহর বিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়েছে। সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও বণ্টনের বিধান আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তাই এ ধরনের আইন করার আগে দেশের বরেণ্য আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদদের মতামত নেওয়া উচিত।” মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “পিতা-মাতাকে সন্তানদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ইসলামি বিধান পরিবর্তন করা যায় না।” তিনি ২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও অধিকার বিষয়ে প্রণীত আইনের কথা উল্লেখ করে যুক্তি দেন, “সেই আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করলেই পিতা-মাতার অধিকার রক্ষা করা সম্ভব।”
রাজনৈতিক দিক থেকে তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় গেলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করা হবে না। অথচ এখন সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীতে কাজ করা হচ্ছে।” আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি তাকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। ইসলামি আইন ও ব্যাংকিং আধুনিক যুগে অচল—এ ধরনের মন্তব্যেরও তিনি প্রতিবাদ জানান।
সরকারকে সতর্ক করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে আইন পাস করলেই জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারেরও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় থাকতে পারেনি”। তিনি সরকারকে জনদাবি ও গণতান্ত্রিক মতামত উপেক্ষা না করে ফিরে আসতে অনুরোধ জানান। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন প্রত্যাহার করা না হলে ইমান ও কোরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রতিবাদে আন্দোলন আরও জোরদার করার কথাও তিনি ঘোষণা করেন।
সমাবেশে জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে সরকার কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন করেছে।” তিনি উত্তরাধিকারের হক কোরআনে নির্ধারিত থাকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফতোয়া বোর্ড ও দেশি-বিদেশি স্কলারদের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান। একই অনুষ্ঠানে মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত নতুন আইনকে ‘কালো আইন’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান তিনি।
দলটির সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সেলিম উদ্দীন, সংসদ সদস্য কামাল হোসেন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি মুহাম্মদ রেজাউল করিমসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।