বাংলার নিম্নবর্গের স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে যোগেন মণ্ডল শেষ পর্যন্ত জিততে পারেননি, যেভাবে ভারত ও পাকিস্তানে চূড়ান্ত বিচারে হেরেছিলেন গান্ধী ও জিন্নাহ। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতা-উত্তর সাত দশকেও পাকিস্তান ও ভারত গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। যোগেনের ‘নিপীড়িত শ্রেণির হিস্যা’ খোঁজার রাজনীতিও সাতচল্লিশ-পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই সাময়িকভাবে পরাজিত হয়েছিল। এটাকে আমরা বলতে পারি দক্ষিণ এশিয়ায় দলিত-মুসলমান বহুজনবাদী রাজনীতির নির্ধারক এক পরাজয়, যে রাজনীতির গোড়ার কথা ছিল ‘বহুজনের অংশগ্রহণমূলক’ সমাজ।

তবে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নবর্গ যোগেনের সেই বহুজনবাদী রাজনীতিরই সন্ধানে আছে আজও। এমনকি হালের রোহিঙ্গা সংকটও দক্ষিণ এশিয়ায় বহুজনবাদী রাজনীতির অনুপস্থিতিজনিত সংকটের কথাই জানান দিচ্ছে। একই শূন্যতার কথা বলছে ভারতের কাশ্মীর, পাকিস্তানের বালুচ, শ্রীলঙ্কার তামিল, নেপালের মধেস, বাংলাদেশের চাকমা-সাঁওতালরা।

যোগেন মণ্ডলের মৃত্যু ভারতে যেমন বর্ণহিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদদের একাংশকে স্বস্তি দিয়েছিল, তেমনি করাচি থেকে তাঁর পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়াও পাকিস্তানে নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে মুসলিম লীগের দক্ষিণপন্থী এলিট নেতৃত্বের বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করেছিল। তারই ফসল বাংলাদেশ। হয়তো প্রায় সেই কারণে আজও বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে যোগেন মণ্ডল বিস্মৃত।

পশ্চিমবঙ্গের বর্ণহিন্দুদের বিবেচনায় যোগেনের কারণেই পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান হয়েছিল। যে জন্য তাঁরা যোগেনকে বলতেন ‘যোগেন আলী মোল্লা’। পাকিস্তানের জিন্নাহ-পরবর্তী মুসলিম লীগ মনে করে, ১৯৫০-এ তাঁর ‘শেষ যুদ্ধ’-এর ব্যর্থতার ফল হয়েছিল এ রকম, প্রায় চল্লিশ বছর সেখানে যোগেনের ভারতে আশ্রয় গ্রহণ ছিল বিশ্বাসঘাতকতাতুল্য। আবার পশ্চিমবঙ্গে ‘বামপন্থী’ সরকার থাকার পরও দলিত-নমশূদ্র ও মুসলমানদের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক বঞ্চনার লক্ষণীয় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। মুসলমানদের শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার উদাহরণ দিয়ে এরূপ বঞ্চনাকে যৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা হয়। কিন্তু তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত নমশূদ্রদের ক্ষেত্রে অনুরূপ বঞ্চনার যুক্তি গ্রহণযোগ্যতা পায় না। ২০১১-এর এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গে শিডিউল কাস্টদের মাঝে শিক্ষার হার প্রায় ৭০ শতাংশ, যা এই রাজ্যের গড় সাক্ষরতার হারের চেয়েও ২ শতাংশ বেশি। নয় কোটি জনসংখ্যার এই রাজ্যে সংখ্যার হিসাবে তারা প্রায় ২৪ শতাংশ। রাজ্যের সমগ্র হিন্দু জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

বাংলাদেশে বেসরকারি হিসাবে পৌনে দুই কোটি হিন্দু জনসংখ্যার মাঝে ৮০ ভাগই শিডিউল কাস্ট। এই হিসাবে দেখা যায়, পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশ মিলে এখনো প্রায় পৌনে তিন কোটি শিডিউল কাস্ট মানুষ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের সর্বশেষ পার্লামেন্টে (২০১৪-১৮) ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছিলেন ১৯ জন। অর্থাৎ মাত্র ৫.৪২ শতাংশ। দীর্ঘদিন মন্ত্রিসভায় জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে কোনো পূর্ণমন্ত্রী ছিলেন না। পরে অবশ্য একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সর্বশেষ পার্লামেন্টে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন মাত্র একজন। সামগ্রিক চিত্রে দলিত-নমশূদ্রদের হিস্যা স্বাভাবিকভাবেই আরও কম হবে।

বাংলাদেশের মতোই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির নীতিনির্ধারণী স্তরেও এরূপ একটি শিক্ষিত বড় জনগোষ্ঠীর ন্যায়সংগত হিস্যার ঘাটতি রয়েছে। বরং সেখানে পূর্বের মতো বর্ণহিন্দুদেরই আধিপত্য চলছে, যারা চাইছে একটা ‘হোমোজেনাইজড নেশন’। কিন্তু আর্থসামাজিক পরিসরে নিম্নবর্গের প্রতি বৈষম্য, বঞ্চনা ও ঘৃণা বলছে ‘হোমোজেনাইজড নেশন’-এর ধারণাটি একটি প্রতারণা মাত্র।

আবার বর্ণহিন্দু নেতৃত্ব এবং দলগুলো হিন্দু বনাম মুসলমান যে বিভাজনরেখা তৈরি করতে তৎপর, তারও লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সমাজে দলিত-নমশূদ্রকেন্দ্রিক বঞ্চনাকে গুরুত্বহীন করা এবং ‘মুসলমানদের মোকাবিলা’য় নমশূদ্র পরিচয় মুছে ‘একক হিন্দু অবস্থান’ তৈরি করা। এর বিপরীতে বামপন্থীদের সমাজতান্ত্রিক আদর্শতাড়িত শ্রেণিধারণাভিত্তিক সমাবেশীকরণ প্রক্রিয়া ব্রাহ্মণ্যবাদভিত্তিক শোষণের বাস্তবতাটি অগ্রাহ্য করে। তাঁদের সেই রাজনীতিও বাস্তবে আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ‘পশ্চিমবঙ্গে জাতিভেদ নেই’ বলে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের লেখক মনোশান্ত বিশ্বাসের ভাষায়, ‘পুরোনো বামপন্থীদের মতো স্বাধীনতা-উত্তর বামপন্থীদের ধারণা ছিল, জাতিগত বিভেদ-বঞ্চনা-বর্ণাশ্রমী মানসিকতা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তি বিপ্লব ও শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবে। কিন্তু বাংলা থেকে বর্ণভিত্তিক রাজনীতির বিদায় ঘটেছে, এমনটি বলা যায় না। উল্লিখিত গবেষক দেখিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের দীর্ঘ শাসনের শেষলগ্নে (২০০৬-১১) রাজ্যের মন্ত্রিপরিষদে ব্রাহ্মণ মন্ত্রী ছিলেন প্রায় ৪১ শতাংশ, অথচ জনসংখ্যায় তাদের হিস্যা মাত্র ২ শতাংশ। পরবর্তী সরকারের সময়ও ৪৪ জন মন্ত্রীর মধ্যে ১৪ জন ছিলেন ব্রাহ্মণ। অথচ জনহিস্যায় তা একজনের বেশি হওয়ার কথা নয়। তবে এ সময় থেকে মুসলমান ও দলিতদের হিস্যা বাড়তে শুরু করে। ১৯৭৭ সালে পশ্চিম বাংলায় বামফ্রন্ট যখন ক্ষমতায় এসেছিল, তখন একজনও দলিত মন্ত্রী ছিলেন না। কিন্তু তাদের ৩৪ বছরের শাসনের পর তৃণমূল প্রথম সরকার (২০১১ সালে) গড়েই শিডিউল কাস্ট কমিউনিটি থেকে সাতজন এবং শিডিউল ট্রাইব থেকে দুজনকে মন্ত্রী করে। একইভাবে মুসলমানদের উপস্থিতিও মন্ত্রিসভায় বাড়ছে। ২০০৬ সালে বামফ্রন্টের শেষ মন্ত্রিসভায় মুসলমান ছিলেন চারজন। আর তৃণমূলের পরবর্তী মন্ত্রিসভায় এই সংখ্যা ছিল ছয়। যদিও এখনো পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কোনো দলিত মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেননি এবং মুসলমান ও দলিতদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার নজির খুবই কম। চাকরির ক্ষেত্রে উপরিউক্ত ধাঁচের বঞ্চনাই বহাল আছে। ২০০১ সালের লোকগণনা অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের হার ছিল ২৫.২৫ শতাংশ। আর ২০০৬ সালের সাচার কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী এই রাজ্যের সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের হার ২.১ শতাংশ। অর্থাৎ জনসংখ্যার হিস্যা অনুযায়ী যা হওয়ার কথা, তার ১২ ভাগের ১ ভাগ। আবার এই ২.১ শতাংশ চাকরিও পাচ্ছে মূলত উর্দুভাষী মুসলমানরা। নিম্নবর্গীয় বাঙালি মুসলমানরা নয়।

যোগেন মণ্ডলের বহুজনবাদ ও দেশভাগআলতাফ পারভেজপ্রকাশক: প্রথমা প্রকাশনপ্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৯পৃষ্ঠা: ১৪৩মূল্য: ৩৬০ ৳

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

এভাবে নানারূপে বর্ণবাদ টিকে আছে বলেই বাংলা ভাগকালে হারিয়ে ফেলা নমশূদ্র-পৌণ্ড্র-বাগদি-মুসলমান ঐক্যের ‘রাজনীতির পরিসর’টি নতুন করে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছে পশ্চিমবঙ্গের নিম্নবর্গরা, যা পশ্চিমবঙ্গে শিডিউল কাস্টের রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

এটা কেবল পশ্চিমবঙ্গেই ঘটছে না। বাকি ভারতেও দেখা যাচ্ছে, বিজেপি-আরএসএস পরিবার একটি বিষয়কে খুবই ভয় পাচ্ছে এবং আড়াল করতে চাইছে তা হলো ‘দলিত-মসলিম ঐকা’ বস্তুত ভারতে এখন দলিত-মুসলমান ঐক্যকে ভিত্তি করে নিম্নবর্গের সমাবেশশক্তি বৃদ্ধির যে আয়োজন চলছে, তা প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৭-পূর্ব যোগেনেরই রাজনৈতিক বিশ্বাস ও তত্ত্ব।

সমগ্র ভারতে জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ হিস্যা (দলিত ১৭ শতাংশ এবং মুসলমান ১৫ শতাংশ) হয়েও দলিত ও মুসলমানরা স্বাধীনতার সাত দশক পরও সবচেয়ে অনুন্নত বর্গ হয়ে আছে ভারতে। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা কার্যত সেখানে দলিত ও মুসলমানদের উচ্চবর্ণের রাজনৈতিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে পারেনি।

কিন্তু বাংলাদেশ যোগেন মণ্ডলকে কেন ভুলে গেছে? বাংলাদেশ ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতিসত্তার প্রথম সফল রাষ্ট্র। সাতচল্লিশে এখানে ‘ম্লেচ্ছ’ আর ‘তফসিলি’রা পূর্ব পাকিস্তানকে নিশ্চিত করেছিল আর একাত্তরে একই জোট পাঞ্জাবি কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু স্বাধীনতা-মৈত্রী-সামাজিক ন্যায়বিচার বাংলাদেশের ব্যবহারিক রাষ্ট্রনৈতিক আদর্শ হতে পেরেছে, এমনটি বলা যায় না। মানুষের প্রতিনিধি বাছাই, সংঘবদ্ধ হওয়া ইত্যাদি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারও এখানে অধরাই রয়ে গেছে বলা যায়। যদিও যোগেনের জাতিঘৃণার প্রতি বৈরিতার শিক্ষা যে বাংলাদেশের ধমনিতে এখনো বহমান, তার একটা বড় নজির প্রায় ১০ লাখ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় সমাজের সচেতন ঐকমত্য।

সাতচল্লিশে এবং একাত্তরে দু-দুটি সফল সংগ্রাম বলে দেয়, যোগেনের স্বপ্নের ইনক্লুসিভ রাজনীতির প্রতি এ দেশের নিম্নবর্গের বিরাট অংশের সমর্থন ছিল। কিন্তু শাসক এলিটদের কারণেই সাতচল্লিশ-পরবর্তী ভারত-পাকিস্তান এবং একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের ‘প্রবল’ জাতিসত্তাগুলো আজও ‘অপর’কে ধারণ করে নতুন সমাজ নির্মাণ করতে সমর্থ হয়নি। অর্থাৎ এখনো কার্যত শাসক-এলিটরা তাদের শাসনাস্ত্র হিসেবে ব্রাহ্মণ্যবাদকে বহাল রাখতে পারছে। সে জন্যই আজও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ‘বহুজনবাদী’ রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়নি। এই রাজনৈতিক-দার্শনিক বোঝাপড়া ছাড়া বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এগোতে পারবে বলে মনে হয় না।