বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে ঢাকায় দুই দিনব্যাপী আন্তসরকার রেলওয়ে বৈঠক (আইজিআরএম) অনুষ্ঠিত হবে। এই বৈঠকে উভয় পক্ষ সম্মতি দিলে আগামী মাস থেকেই আন্তঃদেশীয় তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করার সম্ভাবনা রয়েছে।
গত বছর ২০ থেকে ২২ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে শেষ আইজিআরএম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পালাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়া এই বৈঠকটি কয়েক দফা স্থগিত থাকার পর এবার ঢাকার রেলভবনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচ্য বিষয়গুলো ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত প্রয়োজন হবে, যা দুই দেশের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ থেকে আসবে।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় মৈত্রী এক্সপ্রেসের চলাচল স্থগিত করা হয়। এরপর ১৯ জুলাই থেকে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেসের চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হলেও ভারতের সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হয়নি। রেল কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়, সরকার পরিবর্তনের পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভ্রমণ ভিসা প্রায় বন্ধ করে দেয় এবং বাংলাদেশও ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করে। ভিসা ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হওয়ায় ট্রেন চালুর বিষয়টি এগোয়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর দুই দেশই ধীরে ধীরে ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করতে শুরু করেছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালুসহ অনেক বিষয়ই আলোচনায় আসবে। আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। দুই দেশের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে।
কার্যপত্রে ট্রেন চালুর নির্দিষ্ট তারিখ বা আগের সময়সূচিতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে কি না, সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। তবে বাংলাদেশ এবার আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়টি তুলে ধরবে। এছাড়া ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে চলাচরকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু হয়ে চলাচলের প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ। এতদিন ট্রেনটি যমুনা সেতু হয়ে চলাচল করত। রাজশাহী থেকে কলকাতার পথে নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাবও রাখা হবে। রাতের বেলায় যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা এবং যাত্রীবাহী কোচের পাশাপাশি পার্সেল পরিবহনের জন্য একটি বা দুটি কোচ যুক্ত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হবে।
যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন নিয়েও আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হবে। বাংলাদেশ চায় দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেনের আদান-প্রদান বৃদ্ধি পেতে। বিশেষ করে দর্শনা-গেদে, পেট্রাপোল-বেনাপোল ও রহনপুর-সিংহাবাদ রুটে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। বর্তমানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সীমিত সময়ে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের নিয়ম রয়েছে।
প্রশাসনিক বিষয়ে বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষ রুটভিত্তিক ভিসার পরিবর্তে অন্য ধরনের ভিসা ব্যবস্থার প্রস্তাব তুলে ধরবে। বর্তমানে বিমানে ভারতে গেলে শুধু বিমানেই ফিরতে হয়, ট্রেনে গেলে ফেরার পথেও ট্রেন ধরতে হয়। এই নিয়ম পরিবর্তনের দাবি জানানো হবে। এ ছাড়া ভারতীয় রেলের কাছে বাংলাদেশের বকেয়া অর্থ এবং ভারত থেকে আসা ওয়াগনের নিয়মিত বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা পিরিয়ডিক ওভারহলিংয়ের বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পাবে।
বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করে আসছে। এসব ট্রেন থেকে প্রাপ্ত আয় দূরত্ব অনুসারে বিভাজন করা হয়। বাংলাদেশের ভেতর দূরত্ব বেশি হওয়ায় আয়ের হিস্যা বাংলাদেশ রেলওয়ের বেশি হয়। ভারতীয় সরকারের ঋণে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকার কমলাপুর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত দুটি নতুন রেললাইন নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এখন কাজ শুরু হলেও গতি আশানুরূপ নয় বলে রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কিছু প্রকল্পে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি সরিয়ে নিলেও এসব বিষয় আগামীকালের বৈঠকে উঠে আসবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ রেলের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হবে।
করোনা মহামারার সময় মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের চলাচল ২৬ মাস বন্ধ ছিল। দেশে করোনা সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর ২০২০ সালের ১৫ মার্চ থেকে আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় ছাড়া দুই দেশের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিকই ছিল। মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয় ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে। ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর চালু হয় খুলনা-কলকাতা পথের বন্ধন এক্সপ্রেস। ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ির মধ্যে মিতালী এক্সপ্রেস চলাচল শুরু করে ২০২২ সালের ১ জুন।
সাধারণ যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে তিনটি বন্ধ ট্রেনের ভবিষ্যৎ। দুই বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকা-কলকাতা, খুলনা-কলকাতা ও ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ির সরাসরি রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় এবারের আলোচনায় পুনরায় চালুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বা সমঝোতা হয় কি না, তা যাত্রীদের পরিকল্পনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।