জামালপুর-ঢাকা ও জামালপুর-ময়মনসিংহ রুটে দীর্ঘদিন ধরে রাজিব পরিবহনের একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। বিকল্প যাতায়াতের সুযোগ না থাকায় যাত্রীদের বাধ্য হয়ে এই পরিবহনে নির্ভর করতে হয়। তবে চালকদের মধ্যে যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতা, অতিরিক্ত গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের কারণে সড়কে প্রাণহানীর ঘটনা ঘনঘন হচ্ছে। গত এক মাসে ১০টির বেশি দুর্ঘটনা ও একাধিক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
গত ৩১ আগস্ট সদর উপজেলার লাহিড়ীকান্দা এলাকায় রাজিব পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইজিবাইকের ওপর উল্টে পড়ে। এতে চারজন নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হন। এর আগে ২২ জুলাই নান্দিনা মুদিপাড়া এলাকায় একই পরিবহনের বাসের ধাক্কায় দুই অটোরিকশা যাত্রীর মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের দাবি, গত এক মাসে ছোট-বড় মিলিয়ে ১০টিরও বেশি দুর্ঘটনায় জড়িয়েছে রাজিব পরিবহনের বাস।
জামালপুর জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ওই রুটে রাজিব পরিবহনের প্রায় ৬০টির বেশি বাস চলাচল করে। কাউন্টার থেকে প্রায় ১০ মিনিট পরপর একটি করে বাস ছাড়ার ফলে চালকদের ওপর যাত্রী সংগ্রহ ও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর চাপ তৈরি হয়। ফলে অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনা বাড়ছে। স্থানীয় চাকরিজীবী শাহীনুর রহমান বলেন, "রাজিব পরিবহনের বাস মহাসড়কে প্রায়ই দেখা যায় এক বাস আরেক বাসকে ওভারটেক করার প্রতিযোগিতায় নামছে। যাত্রীদের জীবনের চেয়ে আগে পৌঁছানোই যেন তাদের কাছে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন, "জামালপুর-ময়মনসিংহ রোডে রাজিব ছাড়া অন্য কোনো বাস যাতায়াতও করে না।"
জেলার গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে অন্য মানসম্মত পরিবহন সেবা গড়ে ওঠেনি বলে যাত্রীরা বাধ্য হয়েই এই পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। জামালপুর শহরের বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, "রাজিব পরিবহনের বাস দেখলেই এখন ভয় লাগে। এত দুর্ঘটনার পরও কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।" নান্দিনার বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন, "একটি পরিবহনের বিরুদ্ধে বারবার একই অভিযোগ উঠছে। মানুষ মারা যাচ্ছে, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন নেই। এখন আমরা বিকল্প চাই।"
গত ৩১ আগস্টের দুর্ঘটনার পর নান্দিনা এলাকায় রাজিব পরিবহন বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা দুটি বাসে ভাঙচুর চালায়। এর প্রতিবাদে বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। অন্যদিকে, রাজিব পরিবহনের রুট পারমিট বাতিল ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় ছাত্রশক্তি ও জাতীয় যুবশক্তির নেতাকর্মীরা। ওই কর্মসূচিতে হামলার অভিযোগ ওঠে। পরে হামলার ঘটনায় বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। লিখিত অভিযোগে জামালপুর জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত হোসেন শুভ, সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম জার্নিস, শ্রমিক নেতা মো. হারুন অর রশিদসহ আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত আরও ৫০ থেকে ৭০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
জামালপুর-ঢাকা রুটে ৯০-এর দশকে ‘মুক্তি এন্টারপ্রাইজ’ ছিল যাত্রীদের অন্যতম ভরসা। পরে সেটির কার্যক্রম বন্ধ হলে ধীরে ধীরে রুটে প্রভাব বিস্তার করে রাজিব পরিবহন। ২০০০ সালের দিকে নোয়াখালীর ব্যবসায়ী রিপনের হাত ধরে পরিবহনটির যাত্রা শুরু হয়। তার ছেলে রাজিবের নামেই এটির নামকরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠাতা রিপনের মৃত্যুর পর এখন তার পরিবারের সদস্যরাই পরিবহনটির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বর্তমানে ঢাকার মহাখালী থেকে পরিবারের সদস্য তরিকুল ইসলাম পরিবহনটির সার্বিক তদারকি করছেন বলে জানায় জামালপুর জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি। জামালপুরে সর্বপ্রথম রাজিবের বাস নিয়ে আসেন দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি। তার ছেলে তৌফিকুল ইসলাম প্রান্ত বলেন, "আমার বাবাই জামালপুরে রাজিব বাস সর্বপ্রথম নিয়ে আসেন। ২০১০ সালের দিকে আমরা গেট লক সার্ভিস দিয়েছিলাম। তখন আমাদের প্রতিদিন ভর্তুকি দিতে হতো। তারপর সেগুলো বাতিল করা হয়েছে। আর সময়ের বিষয়টা বাড়ানো গেলে তখন দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে। যাত্রীরা যদি কাউন্টার থেকে টিকিট কাটেন, তাহলেই সব সমাধান সম্ভব।"
সমালোচনার মুখে মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জার্নিস বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা জানান। তিনি বলেন, "বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৬ সালের আগের বাস ধাপে ধাপে বহর থেকে বাদ দেওয়া হবে। কোনো হেলপারকে স্টিয়ারিং ধরতে দেওয়া হবে না এবং দক্ষ চালক নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি বাসের সংখ্যা কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।" তিনি আরও বলেন, "বর্তমানে ১০ মিনিট পরপর বাস ছাড়া হচ্ছে। আগে প্রায় আধা ঘণ্টা পরপর বাস ছাড়ত। ৫ আগস্টের পর প্রায় ২৫-২৬টি বাস বেড়ে যাওয়ায় ব্যবধান কমেছে এবং ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে। বাসের সংখ্যা আর বাড়বে না, বরং কমানোর প্রক্রিয়া চলছে। পুরোনো বাস পর্যায়ক্রমে বাদ দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বাসে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। কোনো হেলপার স্টিয়ারিং ধরলে সেই গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না।" রফিকুল ইসলাম জার্নিস বলেন, "আগের একাধিক চেকপোস্ট তুলে দিয়ে এখন একটি নিয়ন্ত্রণ চেকপোস্ট রাখা হয়েছে। চালকদের ধীরগতিতে চালানো, নির্ধারিত নিয়ম মেনে যাত্রী তোলা এবং প্রতিযোগিতামূলক চালনা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।"
জামালপুর বিআরটিএ-এর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. আনোয়ারুল কিবরিয়া বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, "প্রতি মাসেই আমরা পেশাদার ড্রাইভারদের ট্রেনিং দেই, রোড শো করি। কিন্তু এটার সচেতনতায় আমরা একা বিআরটিএ যথেষ্ট নই। এখানে সড়ক বিভাগ, এলজিইডি, ট্রাফিক পুলিশ এবং সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা আছে।" তিনি বলেন, "যে বাসটা এক্সিডেন্ট করেছে, সেটা কিন্তু ঢাকা মিরপুর বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন করা। গাড়ির কাগজপত্র আপডেট থাকলেও ওই বাসটি আমরা সাসপেন্ড করার জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছি। আর দুর্ঘটনায় বাসের গতির পাশাপাশি অটোরিকশারও ভুল ছিল। পৌরসভার অধীনে থাকা ইজিবাইক বা অটোরিকশার চালকরা প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালান। ভুল কিন্তু একতরফা হয়নি।" ফিটনেস পরীক্ষা সম্পর্কে তিনি বলেন, "ফিটনেস এটা মিরপুর থেকে দেওয়া। জামালপুরের গাড়ি, এটার নম্বরও ঢাকা থেকে। বাস ফিটনেস আমাদের জামালপুর বিআরটিএতে আসে না, ঢাকা থেকেই ফিটনেস করা। তবে আমাদের কাছে যেগুলো আসে, অবশ্যই আমরা একদম গাড়ির উপস্থিতি নিশ্চিত করে ছবি তুলে তারপর ফিটনেস দেই। আনফিট গাড়ির ফিটনেস দেওয়া হয় না। আমাদের জামালপুর থেকে অন্তত দেওয়া হয় না।"