নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গ্যাসের চুলা সরিয়ে ইলেকট্রিক ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার করলে হাঁপানি রোগীদের উপসর্গ কমে এবং ঘরের বাতাসে ক্ষতিকর নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস পায়।
২০২৬ সালে জার্নাল অফ অ্যালার্জি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমিউনোলজি: ইন প্র্যাকটিস-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় হাঁপানিতে আক্রান্ত ৮৫ জন শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের সকলের হাঁপানি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল না এবং তারা গ্যাসের চুলা ব্যবহারকারী পরিবারে বসবাস করতেন। গবেষকরা প্রতিটি বাড়ির গ্যাসের চুলা সরিয়ে ইলেকট্রিক ইন্ডাকশন চুলা স্থাপন করেন। চুলা পরিবর্তনের আগে এবং দুই থেকে তিন মাস পর অংশগ্রহণকারীদের হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের অবস্থা ও ঘরের ভেতরের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা মাপা হয়। ফলাফলে হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের স্কোর গড়ে ২ দশমিক ৬ থেকে কমে ১ দশমিক ৫ হয়েছে। মাঝারি মাত্রার উপসর্গ হালকা মাত্রায় নেমে আসে। একই সময়ে ঘরের ভেতরের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা ২১ পিপিবি থেকে কমে ৬ দশমিক ৩ পিপিবিতে দাঁড়ায়, যা প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস।
চুলা পরিবর্তনের আগের চার সপ্তাহে ১০ জন অংশগ্রহণকারী, অর্থাৎ ১১ দশমিক ৮ শতাংশের জরুরি বিভাগে যেতে হয়েছিল বা হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। চুলা পরিবর্তনের দুই থেকে তিন মাস পরের চার সপ্তাহে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩ জন বা ৩ দশমিক ৫ শতাংশে। হাঁপানির কারণে কাজ বা স্কুলে অনুপস্থিত থাকার দিনও কমেছে। তবে গবেষণাটি ছোট পরিসরের এবং এতে গ্যাসের চুলা ব্যবহার অব্যাহত রাখা কোনো নিয়ন্ত্রণ দল ছিল না। তাই ইলেকট্রিক চুলা বদলালেই সবার হাঁপানি ভালো হবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাচ্ছে না। গবেষকেরাও দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়ন্ত্রিত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়িয়ে রান্না করার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইডের পাশাপাশি নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড বা NO₂ তৈরি হতে পারে। এটি একটি শ্বাসতন্ত্রের জ্বালাপ্রদায়ক দূষক। রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে এই গ্যাস ঘরের ভেতরে জমতে পারে। যাদের হাঁপানি বা অন্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তারা এ ধরনের দূষকের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হতে পারেন। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই হাঁপানি বা অন্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে দূষিত ঘরের বাতাস শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুকে চাপ বা শোঁ শোঁ শব্দের মতো উপসর্গ বাড়াতে পারে।
সবার পক্ষে গ্যাসের চুলা বদলে ইলেকট্রিক চুলা কেনা সম্ভব নাও হতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুতের সংযোগ, রান্নাঘরের অবকাঠামো এবং চুলার খরচ অনেক পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই গ্যাসের চুলা ব্যবহার করলেও রান্নাঘরের বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ভালো রাখা জরুরি। রান্নার সময় সম্ভব হলে রান্নাঘরের জানালা খুলে রাখা বা বাইরে বাতাস বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রান্নার সময় অতিরিক্ত ধোঁয়া তৈরি না করা এবং চুলা ও রান্নাঘর পরিষ্কার রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণ এক্সহস্ট ফ্যান বা হুড কতটা কার্যকর হবে, তা তার ধরন ও বাইরে বাতাস বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না, তার ওপর নির্ভর করে। আগের একটি গবেষণায় গ্যাসের চুলার বদলে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করলে ঘরের NO₂-এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। একই গবেষণায় নির্দিষ্ট ধরনের এয়ার পিউরিফায়ারও কিছুটা NO₂ কমাতে পেরেছিল।
ইলেকট্রিক চুলায় পরিবর্তন করা হাঁপানির চিকিৎসার বিকল্প নয়। হাঁপানির রোগীদের চিকিৎসকের দেওয়া ইনহেলার বা অন্য ওষুধ নির্ধারিত নিয়মে চালিয়ে যেতে হবে। ধুলো, ধোঁয়া, পরাগরেণু, সিগারেটের ধোঁয়া এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মতো অন্য ট্রিগার থেকেও দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে। গবেষণার লেখকেরাও বলেছেন, চুলা পরিবর্তন হাঁপানির নিরাময় নয় এবং এটি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ নাও করতে পারে। বাংলাদেশে অনেক পরিবার গ্যাস, এলপিজি বা অন্যান্য জ্বালানি ব্যবহার করে রান্না করে। ফলে ঘরের ভেতরের বায়ু চলাচল এবং রান্নার ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের চুলা ব্যবহার করা ৮৫ জন হাঁপানি রোগীর ওপর পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশের রান্নাঘর, জ্বালানি ব্যবহারের ধরন, ঘরের আকার ও বায়ু চলাচলের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তাই গবেষণার ফলাফল সরাসরি বাংলাদেশের সব পরিবারের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে, এমনটা বলা যায় না। তারপরও একটি বিষয় পরিষ্কার, রান্নার সময় ঘরের ভেতরে তৈরি দূষক শ্বাসযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই হাঁপানির রোগী থাকা পরিবারে রান্নাঘরের বায়ু চলাচল ভালো রাখা এবং ধোঁয়া ও দূষকের সংস্পর্শ কমানোর চেষ্টা করা উপকারী।
গ্যাসের চুলা বদলানোর সুযোগ থাকলে তা একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হতে পারে, বিশেষ করে হাঁপানি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে না থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। তবে এর পাশাপাশি কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত হাঁপানির ওষুধ ব্যবহার করা, রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, সিগারেটের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকা, ঘরের ধুলা ও ধুলিকণা নিয়ন্ত্রণ করা, হাঁপানির ব্যক্তিগত ট্রিগারগুলো চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলা, বারবার শ্বাসকষ্ট হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা। গ্যাসের চুলা শুধু রান্নার জন্য ব্যবহৃত একটি যন্ত্র নয়, এটি ঘরের ভেতরের বায়ুর মানকেও প্রভাবিত করতে পারে। নতুন একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, গ্যাসের চুলার বদলে ইলেকট্রিক ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহারের পর ভালোভাবে নিয়ন্ত্রিত না থাকা হাঁপানির রোগীদের উপসর্গ কমেছে এবং ঘরের নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। তবে গবেষণাটি ছোট এবং এতে নিয়ন্ত্রণ দল ছিল না। তাই এই ফলাফলকে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বা হাঁপানির নতুন চিকিৎসা হিসেবে দেখা যাবে না। বরং গবেষণাটি ঘরের বায়ুদূষণ এবং হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের সম্পর্কের দিকে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। যাদের হাঁপানি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে নেই, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রান্নার ধোঁয়া ও গ্যাসের চুলা থেকে তৈরি দূষকের সংস্পর্শ কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা যেতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি