কিশোরগঞ্জের ইটনায় প্রায় অর্ধশতক পর ফিরে এলো গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) উপজেলার ধনপুর বাজার-সংলগ্ন সুরমা নদীতে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, যেখানে লাখো মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে ওঠে হাওরের জলরাশি।
সকাল থেকেই নদীর দুই তীরে এবং সহস্রাধিক নৌকায় ভিড় জমিয়েছিলেন দর্শনার্থীরা। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ থেকে আসা মানুষ এই রুদ্ধশ্বাস লড়াই উপভোগ করেন। আয়োজকদের দাবি, বিকেল পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে লাখো মানুষের সমাগম ঘটেছে।
দুপুর ১২টায় শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতায় ১২টি দৌড়ের নৌকা অংশ নেয়। স্থানীয়দের মতে, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নৌকাবাইচের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। সময়ের আবর্তে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছিল এবং ইটনায় সর্বশেষ প্রায় ৫০ বছর আগে এমন আয়োজন হয়েছিল। সেই হারানো উৎসবকে পুনরুজ্জীবিত করতেই এবার সুরমা নদীতে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
ধনপুর এলাকার জিতেন্দ্র দাস বলেন, "নৌকাবাইচ শুধু বিনোদন নয়, এটি গ্রামবাংলার শতবর্ষী ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। আধুনিকতার প্রভাবে জারি, সারি, ভাটিয়ালি গান, লাঠিখেলা ও অন্যান্য লোকজ আয়োজন হারিয়ে যেতে বসেছে।"
নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার বাসিন্দা মোবাশ্বির ফয়সাল জীবনে প্রথমবার এই নৌকাবাইচ দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, "ছোটবেলা থেকে মুরব্বিদের মুখে নৌকাবাইচের রোমাঞ্চের গল্প শুনেছি। আশপাশের এলাকায় কয়েকবার আয়োজন হলেও কখনো যাওয়ার সুযোগ হয়নি। এবার শুনলাম মামার বাড়ির পাশেই সুরমা নদীতে নৌকাবাইচ হচ্ছে, তাই বন্ধুদের নিয়ে একটি ছোট নৌকায় করে চলে এসেছি।"
তিনি আরও বলেন, "হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে এই আয়োজন উপভোগ করে দারুণ লাগছে। আমরা চাই, হাওরের প্রতিটি এলাকায় প্রতিবছরই এমন নৌকাবাইচের আয়োজন করা হোক।"
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের উৎসাহে ধনপুর ইউনিয়নবাসী এই আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় সোনার হরিণ, দ্বিতীয় পুরস্কার রুপার ময়ূর এবং তৃতীয় পুরস্কার একটি এলইডি টেলিভিশন। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ফজলুর রহমান।
ফজলুর রহমান বলেন, "নৌকাবাইচ ভাটিবাংলার প্রাণের উৎসব। ৫০ বছর পর এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রেখে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। এই নৌকাবাইচে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটেছে। হাওরের মানুষ অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছে এবং খুবই সুশৃঙ্খলভাবে তা উপভোগ করেছে। হাওরের হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর নৌকাবাইচের আয়োজন করা হবে।"
আয়োজক কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমেশ চন্দ্র গোপ জানান, সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ নৌকা নিয়ে নদীর দুই পাড়ে ভিড় করেন এবং দুপুরের পর দর্শনার্থীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়।
অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ ভিপি সোহেল, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী উম্মে কুলসুম রেখা এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রতনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।