বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী দিনে দেশে যে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে, তার সাথে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণের যখনই প্রয়োজন হবে, আন্দোলনের ডাক তখনই আসবে।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম।

সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষের দেওয়া গণরায়কে অস্বীকার করে জনগণের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। সেই গণআকাঙ্ক্ষা ও রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিরতি বা থামাথামি ছাড়াই লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে। একই সাথে আন্দোলনের গতিকে রুদ্ধ করতে আসা যেকোনো ধরনের লোভ বা প্রলোভন সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা হলো।

তিনি বলেন, এই সরকার জনগণকে কোনো স্বস্তি দিতে পারেনি। বর্তমানে দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট থাকলেও গ্রাহকদের নিয়মিত ভৌতিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। তেল ও জ্বালানির জন্য চতুর্দিকে হাহাকার চলছে। এছাড়া দলীয় আনুকূল্যে ভয়াবহ আকারে সন্ত্রাস ও রাহাজানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের ৭০ ভাগ জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আমরা তা আদায় করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এর আগে আমরা বিরতি দেব না, আমরা থামব না। এ লড়াই আমাদের চলবেই এবং বাংলাদেশও ইনশাল্লাহ বদলাবে।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া সমস্যার সমাধান যদি আপনারা করতে না পারেন, তবে সেটি সবার আগে জনগণের কাছে স্বীকার করুন। স্বীকার করুন যে, এই সমস্যার সমাধান আপনাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। স্বীকার করুন যে, আপনাদের কাছে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কোনো সঠিক পরিকল্পনা নেই। অবিলম্বে বিরোধী দলের সাথে আলোচনায় বসুন; বিরোধী দল সমর্থন না দিলে এই দেশ আপনাদের পক্ষে একা চালানো সম্ভব নয়— এই বাস্তবতা মেনে নিন।

তিনি বলেন, আমরা পতিত স্বৈরাচারকে ফিরে আসার কোনো পথ করে দিচ্ছি না, বরং আপনারাই সেই পথ করে দিচ্ছেন। কারণ জনগণকে আপনারা সমস্যার সমাধান দিতে পারছেন না এবং তাদের হক আদায় করতে পারছেন না। এর ফলে জনগণ বিকল্প খুঁজছে এবং সেই বিকল্প শক্তি কারা, তা আজকের এই লংমার্চে বাংলাদেশের জনগণ দেখেছে। আমরা যেমন পতিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আছি এবং পতিত স্বৈরাচার কোনোভাবেই দেশে ফেরত আসতে পারবে না, একইভাবে নতুন কোনো স্বৈরাচারের রাস্তা আমরা এই বাংলাদেশে তৈরি হতে দেব না।

সভাপতির বক্তব্যে ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, আমরা নিজেদের স্বার্থে নয়, দেশের মানুষের স্বার্থে রাজপথে এসেছি। আমরা একটি সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসনের বাংলাদেশ গড়তে চাই, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে ১১ দলীয় জোট ছাড়া অন্য কারও পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। দেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছে, ব্যাংকে কোনো টাকা নেই এবং প্রতিদিন নতুন নোট ছেপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

বর্তমান প্রশাসনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে উনারা ছয় মাসের মধ্যে এক লক্ষ মানুষকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় আসার পর উল্টো এক লক্ষ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ক্ষমতার মসনদে বসার পর বিএনপি ‘জুলাই সনদের’ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে গাদ্দারি ও বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। তারা দেশের সাথে, ইতিহাসের সাথে, দেড় সহস্র শহীদের রক্তের সাথে গাদ্দারি করেছে। এখন মহান সংসদে দাঁড়িয়ে বিএনপির মুখপাত্রের মুখে শুনতে হয় যে, তারা গণভোট মন থেকে বা আন্তরিকভাবে সংস্কার করার ঐকমত্য পোষণ করেনি; বরং শুধুমাত্র নির্বাচন আদায় করাই ছিল বিএনপির আসল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, চট্টগ্রামের এক নেতা বলেছিলেন নাকি লংমার্চের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কিন্তু পথে পথে যে জনসমুদ্র দেখেছি, তাতে বুঝেছি জনগণ আপনাদের কোনো ছাড় দেবে না। অবিলম্বে জুলাই সনদ মেনে জনদাবি পূরণ করতে হবে।

এ সময় বক্তব্য রাখেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ কে এম হামিদুর রহমান আজাদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, লেবার পার্টির মুখপাত্র মাওলানা নাজমুল ইসলাম তালুকদার, দীর্ঘদিন গুমের শিকার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীরপ্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ ফয়সাল, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম।

এ ছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি মাওলানা এমদাদুল্লাহ সোহাইল, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরী আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ওমর ফারুক, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম, চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম অঞ্চল টিম সদস্য জাফর সাদেক, এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি চট্টগ্রাম মহানগরী আমির মাওলানা জিয়াউল হোসাইন, ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগর উত্তরের সভাপতি মাইমুনুল ইসলাম মামুন, এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের যুগ্ম আহ্বায়ক খান তালাত মাহমুদ রাফি, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী, জাগপার চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি আবু মোজাফফর মোহাম্মদ আনাস, লেবার পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলী, এলডিপি চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি সৈয়দ গিয়াস উদ্দিন আলম, এবি পার্টি চট্টগ্রাম মহানগরীর আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট গোলাম ফারুক, এলডিপির চট্টগ্রাম মহানগরীর সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মোতালেব ও খেলাফত মজলিসের নেতা আতিক বিন ওসমান।

সমাপনী সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি প্রকৌশলী রাশেদ প্রধান, এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতু এমপি, সেগুফতা বুশরা মিশমা, জামায়াত নেতা ইয়াছিন আরাফাত, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান, জামায়াত নেতা মোবারক হোসেন, অধ্যাপক আহসানুল্লাহ ভূঁইয়া, অধ্যাপক নুরুল আমিন চৌধুরী প্রমুখ।

১১ দলীয় ঐক্যের মূল দাবিগুলো হলো— গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা।

এর আগে সকালে ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ শুরু হয়। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা, সংবর্ধনা ও অভিবাদন কর্মসূচির পর লংমার্চটি চট্টগ্রামে এসে পৌঁছায়। এই কর্মসূচিতে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রীজ সংলগ্ন ট্রাকস্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল ও মীরসরাইয়ে একাধিক পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে সমাপনী জনসভার মাধ্যমে লংমার্চ কর্মসূচি শেষ হয়।

গত ৬ আগস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা থেকে চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লংমার্চ’ ও মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোটের শীর্ষ নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লংমার্চ শেষে আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।