মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের একটি আয়োজন বিনা মূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভা। এ আয়োজনের আওতায় গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ মুক্তকণ্ঠের কার্যালয় কারওয়ান বাজারে ১৮১ তম অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত থেকে পরামর্শ প্রদান করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান। এইবারের বিষয়টি ছিল — ‘শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ভূমিকা।' অনুষ্ঠানটি সাক্ষাৎকার আকারে তুলে ধরা হলো।
বর্তমান যুগের প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ব এবং তাদের সার্বিক বিকাশে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে?
ডা. ফারজানা রহমান: এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী একটি বিষয়। শিশুর মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে যে শিশু-কিশোরদের দৈহিক বিকাশের পাশাপাশি তাদের মানসিক ও আবেগীয় বিকাশও সমান্তরালভাবে ঘটে। মৌলিকভাবে শিশু-কিশোররা সবসময়ই আবেগপ্রবণ, অনুভূতিপ্রবণ, অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং অনুকরণপ্রিয়—এই গুণগুলো আগের দিনের শিশুদের মতো এখনো একই রয়েছে।
তবে মূল পরিবর্তনটি এসেছে তাদের আশেপাশের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায়। এখন প্রযুক্তি হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। দক্ষিণ এশিয়া বা বাংলাদেশের একটি প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুও মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের উন্নত দেশের একটি শিশুর জীবনযাত্রার সাথে নিজেকে তুলনা করতে পারছে। এই প্রযুক্তির জোয়ারের কারণে শিশুদের মনোযোগ ধারণ করার ক্ষমতা বা 'অ্যাটেনশন স্প্যান' মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পূর্বে যে বয়সের শিশুরা টানা ৩০ মিনিট কোনো বিষয়ে গভীর মনোযোগ ধরে রাখতে পারত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৯ থেকে ১৫ মিনিটে। এছাড়া অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে খেলাধুলা বা শারীরিক চর্চা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেমন: গান, আবৃত্তি, বই পড়া ইত্যাদি থেকে শিশুরা দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে একটি বড় ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে।
এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের যুগে শিক্ষার্থীদের জীবনের শিক্ষকের ভূমিকা ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?
ডা. ফারজানা রহমান: শিক্ষক হলেন প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম প্রধান প্রেরণা। আমাদের সমাজে শিশুরা যতই জেমস বন্ড, স্পাইডারম্যান বা সুপারম্যানের ভক্ত হোক না কেন বাস্তব জীবনে তাদের প্রথম আইকন বা আইডল কিন্তু থাকেন তাদের শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকগণ। বাবা-মা যত বড় সাইকোলজিস্ট, নিউরোলজিস্ট বা অর্থনীতিবিদই হোন না কেন, শিশুদের কাছে তাদের শিক্ষকের কথাই শেষ কথা।
শিশুরা প্রতিদিন একটি বড় সময় প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যালয়ে পার করে। তাই এই বদলে যাওয়া সময়ে শিক্ষকের ভূমিকাও অনেক বদলে গেছে। একজন শিক্ষকই সবচেয়ে আগে বুঝতে পারেন কোনো শিক্ষার্থী ঠিক কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পড়াশোনায় মনোযোগ কমার কারণটি কি কেবল আলসেমি নাকি অন্য কোনো মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা তা চিহ্নিত করার প্রথম সুযোগটি শিক্ষকের কাছেই আসে। তাই অভিভাবকের পাশাপাশি একজন দায়িত্বশীল শিক্ষকের সচেতন ভূমিকা শিশু মনস্তত্ত্ব গঠনে সবচেয়ে বেশি দরকার।
কোন লক্ষণ বা সংকেতগুলো দেখে একজন শিক্ষক বুঝতে পারবেন যে তাঁর শিক্ষার্থী কোনো মানসিক জটিলতা বা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে?
ডা. ফারজানা রহমান: শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে দৈনন্দিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই কিছু পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারেন। শিক্ষার্থী মানসিক ঝুঁকিতে থাকলে তার আচরণের কিছু নির্দিষ্ট পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
প্রাণচঞ্চলতা কমে যাওয়া: আগে যে শিশুটি খুব হাসিখুশি ও প্রাণচঞ্চল ছিল, সে হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যাওয়া বা নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নেওয়া শুরু করে।
মনোযোগ ও ফলাফলের অবনতি: পড়াশোনা ও শ্রেণিকক্ষের কাজে হঠাৎ মারাত্মক অমনোযোগ দেখা দেওয়া এবং পরীক্ষার ফলাফলের ধারাবাহিক অবনতি হওয়া।
আচরণগত তীব্র পরিবর্তন: আচরণের মধ্যে অস্বাভাবিক জেদ, রাগ, অকারণে সহিংসতা প্রকাশ পাওয়া বা বন্ধুদের সাথে দূরত্ব তৈরি করা।
হতাশাজনক কথা বলা: জীবনের প্রতি বীতিষ্ণা প্রকাশ করা, নিজেকে সবার জন্য ‘বোঝা’ মনে করা বা ‘বেঁচে না থাকলেই ভালো হতো’ এই ধরণের চরম হতাশাজনক কথা বলা।
শিক্ষক যদি কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে এই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, তবে বিষয়টি একেবারেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
একটি শিশুর মনস্তত্ত্ব ভেঙে পড়ার পেছনে সাধারণত কোন ধরনের পারিবারিক বা পরিবেশগত কারণগুলো দায়ী থাকে?
ডা. ফারজানা রহমান: শিশুদের মনোজগত অত্যন্ত নাজুক। তাদের শৈশব ও কৈশোরে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের নেতিবাচক ঘটনাগুলো গভীর ক্ষত তৈরি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো:
পারিবারিক অশান্তি ও বিচ্ছেদ: বাবা-মায়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন, নিয়মিত ঝগড়া-বিবাদ কিংবা বিচ্ছেদ শিশুদের মনস্তত্ত্বে গভীর চাপ সৃষ্টি করে।
আবেগীয় অবহেলা : আজকাল অনেক শিশু অভিযোগ করে যে প্রয়োজনের সময় তারা বাবা-মাকে মানসিকভাবে কাছে পায় না। বাবা-মা হয়তো শারীরিকভাবে আছেন, কিন্তু আবেগীয়ভাবে তাদের সময় দিচ্ছেন না।
বুলিং ও বডি শেমিং: বিদ্যালয়ে বা বন্ধু মহলে শারীরিক গঠন, রূপ কিংবা পড়ার দক্ষতা নিয়ে উপহাস বা কটূক্তির (বুলিং) শিকার হওয়া।
সহিংসতা ও শারীরিক নির্যাতন: পরিবার বা বাইরে মারধর, গালিগালাজ বা ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনের শিকার হলে শিশুর মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
প্রতিকূল পরিবেশে থাকা এসব শিক্ষার্থীদের সহায়তায় শিক্ষকরা কীভাবে একটি ‘প্রতিরোধমূলক ঢাল’ হিসেবে কাজ করতে পারেন?
ডা. ফারজানা রহমান: গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক বা পরিবেশগত হাজারো প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও একজন শিশু সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারে যদি তার পাশে অন্তত একজন সহানুভূতিশীল মানুষ থাকেন। আর সেই মানুষটি হতে পারেন একজন শিক্ষক।
কোনো শিশু যখন বুঝতে পারে যে তার বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাকে বিচার না করে মন দিয়ে শুনছেন, তাকে অবহেলা করছেন না এবং তার প্রতি যত্নশীল—তখনই সেই শিশুর আত্মবিশ্বাস ফিরতে শুরু করে। শিক্ষকরা শুধু পাঠ্যবই পড়ানোর দায়িত্বে থাকেন না; তাঁরা যদি কোনো শিক্ষার্থীর মানসিক সংকট বুঝতে পেরে তার সাথে খোলামেলা কথা বলেন, তাকে সহানুভূতি জানান এবং প্রয়োজনে সঠিক মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শকের দিকনির্দেশনা দেন, তবে একটি ভেঙে পড়া জীবনও আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসতে পারে।
প্রযুক্তি ও স্মার্টফোনের যুগে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখার জন্য শিক্ষকদের পড়ানোর পদ্ধতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা উচিত?
ডা. ফারজানা রহমান: এখনকার আধুনিক যুগে পুরানো ধাঁচের ঢালাও লেকচার পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা অসম্ভব। যেহেতু শিক্ষার্থীদের মনোযোগের সময়সীমা ৯ থেকে ১৫ মিনিটে নেমে এসেছে, তাই শিক্ষকদের পড়ানোর কৌশলে বৈচিত্র্য আনতে হবে:
ইন্টারেক্টিভ লার্নিং: একমুখী শিক্ষার বদলে শ্রেণিকক্ষে প্রশ্নোত্তর পর্ব, দলগত কাজ এবং আলোচনার সুযোগ বেশি রাখা।
ছোট ছোট পর্বে পাঠ ভাগ করা: একটানা দীর্ঘ সময় না পড়িয়ে ছোট ছোট পর্বে আলোচনা শেষ করা এবং মাঝে মনস্তাত্ত্বিক বিরতি দেওয়া।
সংস্কৃতি ও খেলার সংযোগ: পড়াশোনার সাথে ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট, ছোট নাটক, বা সংস্কৃতিচর্চাকে অন্তর্ভুক্ত করা যাতে তারা মোবাইল স্ক্রিনের মতো আনন্দ শ্রেণিকক্ষেই খুঁজে পায়।
শিক্ষক যখন শিক্ষাদানের ধরন আধুনিক করবেন, তখন শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনায় আনন্দ পাবে এবং তাদের মানসিক বিকাশও ইতিবাচক হবে।
পরিশেষে, আমাদের অভিভাবক এবং শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে আপনার মূল বার্তা কী থাকবে?
ডা. ফারজানা রহমান: আমার মূল বার্তা থাকবে—আমাদের শিশুদের কেবল শারীরিক সুস্থতা বা ভালো ফলাফলের পেছনে দৌড় করালেই চলবে না, তাদের মানসিক সুস্থতার প্রতি সমান নজর দিতে হবে। অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মধ্যে একটি সুন্দর সমন্বয় থাকতে হবে। শ্রেণিকক্ষে কোনো সমস্যা দেখলে শিক্ষকরা যেমন অভিভাবকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন, তেমনি অভিভাবকরাও শিক্ষকের সাথে সহযোগিতা করবেন।
আমরা যদি আমাদের সন্তান ও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাহিদাগুলো বুঝতে পারি এবং ভালোবাসার সাথে তাদের পাশে দাঁড়াই, তবে আমরা একটি সুস্থ, মানসিক শক্তিসম্পন্ন ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সক্ষম হব।