মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টের একটি আয়োজন বিনা মূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভা। এ আয়োজনের আওতায় ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মুক্তকণ্ঠের কার্যালয় কারওয়ান বাজারে ১৮০ তম অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় উপস্থিত থেকে পরামর্শ প্রদান করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকরী অধ্যাপক ডা. জোবায়ের মিয়া। এইবারের বিষয়টি ছিল—‘সন্তানের মন বোঝার উপায়।’ অনুষ্ঠানটি সাক্ষাৎকার আকারে তুলে ধরা হলো।

ডা. জোবায়ের মিয়া, আপনাকে স্বাগত জানাই।

ডা. জোবায়ের মিয়া: ধন্যবাদ আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।

বয়ঃসন্ধিকালে বা সন্তান বড় হওয়ার সময় তাদের মানসিক জগতে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যা অভিভাবকদের বোঝা প্রয়োজন?

ডা. জোবায়ের মিয়া: বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটি নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও সত্তা জাগ্রত হয়। তারা তখন একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে নিজের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করার অধিকার চায়। অভিভাবক হিসেবে আমরা অনেক সময় অতি স্নেহের কারণে বা তাদের 'বাচ্চা' ভেবে তাদের এই অধিকার বা মতামতকে এড়িয়ে যাই। পরিবারে কোনো সিদ্ধান্তের সময় মতামত গুরুত্ব না পেলে তাদের মধ্যে একধরনের ক্ষোভ তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই অভিভাবকদের সাথে 'জেনারেশন গ্যাপ' বা মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়।

সাইকোলজির দিক থেকে প্যারেন্টিং বা অভিভাবকত্বকে কীভাবে ভাগ করা হয় এবং এর প্রভাব সন্তানদের ওপর কেমন পড়ে?

ডা. জোবায়ের মিয়া: প্যারেন্টিং মূলত চার ধরনের দেখা যায়:

কর্তৃত্ববাদী: এখানে নিয়মকানুন থাকে, তবে সন্তানের মতামতের সুযোগ থাকে। এতে সন্তানরা সুশৃঙ্খল ও আত্মবিশ্বাসী হয়।

কর্তৃত্বপরায়ণ : এখানে অভিভাবকেরা অত্যন্ত কঠোর হন এবং নিজের মতামত চাপিয়ে দেন। ফলে সন্তানেরা মনে কষ্ট চেপে রাখে, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং অভিভাবকদের থেকে দূরে সরে যায়।

অবহেলাপূর্ণ : পড়াশোনা বা আবেগের দিকে খেয়াল না রেখে শুধু আর্থিক দায়িত্ব পালন করা। এতে সন্তানেরা হতাশায় ভোগে।

অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া : সন্তান যা চায় তাতেই হ্যাঁ বলা। এতে সন্তানের আচরণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে।

সন্তান যদি নিজের কথা সহজে না বলতে চায় বা অন্তর্মুখী (Introvert) হয়, তবে অভিভাবক কীভাবে তার মন বুঝবেন?

ডা. জোবায়ের মিয়া: সব শিশু সমান হয় না। কিছু শিশু প্রাণবন্ত হয় এবং সব কথা বলে দেয়। কিন্তু যারা অন্তর্মুখী, তারা যদি অভিভাবককে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে না পারে—যেমন তাদের কথা নিয়ে অন্যদের সামনে আলোচনা বা উপহাস করা হবে—তবে তারা মনের কথা লুকিয়ে ফেলে। এদের ওপর স্পাই বা নজরদারি না করে পাশে বসতে হবে। পড়ার টেবিলে অমনোযোগী হলে বা আনমনা থাকলে একটু সময় দিয়ে পরম মমতায় ও ট্রাস্ট তৈরি করে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

অভিভাবকদের কোন ধরনের ভুল আচরণগুলো সন্তানদের মানসিক বিকাশকে ধামাচাপা দেয় বা ক্ষতিগ্রস্ত করে?

ডা. জোবায়ের মিয়া: আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় ভুল হলো সন্তানদের অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা বা ‘গরু-গাধা’ জাতীয় অপমানসূচক শব্দ ব্যবহার করা। সন্তান যখন দেখে ভালো করলেও প্রশংসা মিলছে না, তখন তার ভালো করার আগ্রহ কমে যায়। সন্তানের ছোট ছোট সাফল্যকেও মূল্যায়ন করতে হবে এবং পুরস্কৃত করতে হবে। তা ছাড়া অভিভাবকেরা নিজেরা সারাক্ষণ ডিভাইসে আসক্ত থেকে সন্তানকে রাতে দ্রুত ঘুমাতে বা ডিভাইস ছাড়তে বললে সন্তান কখনোই তা শুনবে না।

কোনো সন্তান মানসিক কষ্টে থাকলে বা ঝুঁকিগ্রস্ত হলে তার আচার-আচরণে কোন লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়?

ডা. জোবায়ের মিয়া: বেশ কিছু লক্ষণ দেখে অভিভাবকেরা সতর্ক হতে পারেন:

- হঠাৎ করে নিজের জগতে গুটিয়ে যাওয়া, ঘরকুনো হয়ে যাওয়া এবং একা থাকা।

- পড়াশোনা বা ভালো ফলাফলের ধারাবাহিক অবনতি হওয়া।

- আগে যেসব খেলাধুলা বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে আগ্রহ ছিল, তা থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা।

- রেগে যাওয়া, কথা বললে বাজে রিঅ্যাক্ট করা বা সারাক্ষণ মেজাজ খিটখিটে রাখা।

- স্কুলে বা বাইরে বোলিং বা কোনো নির্যাতনের শিকার হওয়া।

সন্তান যখন কোনো জটিল সামাজিক বা মানসিক সমস্যায় পড়ে, তখন অভিভাবক কীভাবে তার সঙ্গে কথা শুরু করবেন?

ডা.জোবায়ের মিয়া: শুরুতেই কোনো বিচার করা বা দোষ দেওয়া যাবে না। সন্তান প্রথমে অস্বীকার করতে পারে। তখন একটু পজ দিয়ে মিষ্টি সুরে বলতে হবে—      "তোমাকে তো কয়েক দিন ধরে একটু অন্যরকম দেখছি, তোমার কি মন খারাপ? কোনো আপত্তি না থাকলে আমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারো। " তাকে দিনে অন্তত ১০-১৫ মিনিট নিবিড় সময় দিলে এবং সে নিরাপদ বোধ করলে নিজের কষ্টের কথা কান্নাকাটি করে হলেও প্রকাশ করে দেবে।

অভিভাবকেরা কখন বুঝবেন যে ঘরের চেষ্টার বাইরে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা প্রয়োজন?

ডা. জোবায়ের মিয়া: যখন দেখা যাবে যে সব ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ চেষ্টা সত্ত্বেও ৬ মাস বা ১ বছর ধরে সন্তানের রেজাল্ট ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে, আচরণে তীব্র পরিবর্তন এসেছে, বা মারাত্মক ডিভাইস আসক্তি/মাদকাসক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তখন কোনো দ্বিধা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, রোগের চিকিৎসা এবং আচরণগত কাউন্সেলিং সময়মতো শুরু করলে সন্তানকে স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।

ডা. জোবায়ের মিয়া: মুক্তকণ্ঠ ও মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্টকেও ধন্যবাদ।