পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে যে গভীর সংকট তৈরি হয়েছিল, তা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ। তাঁর চিন্তায় স্থির মতাদর্শের চেয়ে জনগণের প্রয়োজন, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও উপযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। এই প্রেক্ষিতে তাঁর উত্থাপিত রাষ্ট্র, ধর্ম ও গণতন্ত্র বিষয়ক প্রশ্নাবলী আজও সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখেছে।

আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পরিষদ তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে ‘ধর্মশাসিত রাষ্ট্র, না রাষ্ট্রশাসিত ধর্ম?’ শীর্ষক আলোচনা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হুইটম্যান কলেজের শিক্ষক ও গবেষক তৈমুর রেজা ‘আবুল মনসুর আহমদ: ডেমোক্রেসি অ্যান্ড দ্য নোভেল্টি অব দ্য পাকিস্তানি কনস্টিটিউশনাল এক্সপেরিমেন্ট’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ১৯৫৬ সালের গণপরিষদে আবুল মনসুর আহমদ ‘ফেডারেল কাঠামো’ নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার মূল ভিত্তি ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যাগত বাস্তবতা এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার রাজনৈতিক সংকট। পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্বের আশঙ্কা ছিল শক্তিশালী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হলে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সেই কেন্দ্রের ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে চলে যাবে। জনগণের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা এবং এমন একটি ফেডারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কেন্দ্রের ক্ষমতা সীমিত থাকবে—এটাই ছিল তাঁর অবস্থানের মূল ভিত্তি।

তৈমুর রেজা আরও ব্যাখ্যা করেন, আবুল মনসুর আহমদের ফেডারেল চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল ‘দুই অর্থনীতি’ ধারণা। ভৌগোলিকভাবে ভারতের প্রায় এক হাজার মাইল ভূখণ্ড দিয়ে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তানের দুই অংশকে তিনি অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকেও পৃথক হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কাঠামো ও স্বার্থকে একটি একক অর্থনৈতিক কাঠামো দিয়ে বিচার করলে পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনা অব্যাহত থাকবে। আবুল মনসুর আহমদকে উদ্ধৃত করে এই শিক্ষক বলেন, কেন্দ্রের হাতে অধিকাংশ ক্ষমতা থাকলে এই বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়। তাই তাঁর প্রস্তাবিত ফেডারেল ব্যবস্থায় কেন্দ্রের ক্ষমতা সীমিত করার পাশাপাশি প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি ছিল মৌলিক। তিনি লাহোর প্রস্তাব ও ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী অঙ্গীকারকে গণপরিষদের সদস্যদের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন। যুক্তফ্রন্ট যে তিনটি বিষয়ের ফেডারেশনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছিল, সেই অঙ্গীকারের বাইরে গিয়ে গণপরিষদ ইচ্ছেমতো সংবিধান প্রণয়ন করতে পারে না—এটাই ছিল তাঁর যুক্তির অন্যতম ভিত্তি।

গবেষক তৈমুর রেজার প্রবন্ধে উঠে আসে আবুল মনসুর আহমদের ‘ইসলামিক রিপাবলিকানিজম’–এর ধারণার সমালোচনাও। তৈমুর রেজা বলেন, ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পাকিস্তানকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ হিসেবে ঘোষণা করার ধারণাকে আবুল মনসুর আহমদ একধরনের বিপর্যয় হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর যুক্তির একটি দিক ছিল ১৯৫৪ সালের নির্বাচন। সে সময় মুসলিম লীগ ইসলামিক সংবিধানের পক্ষে প্রচার করেছিল এবং ভোটারদের বলেছিল, তাদের ভোট দিলে ইসলামিক সংবিধান প্রতিষ্ঠিত হবে। বিপরীতে যুক্তফ্রন্টও ইসলামবিরোধী কোনো অবস্থান নেয়নি। কিন্তু নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রায় ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ আসনে জয়ী হয়। আবুল মনসুর আহমদের পাঠ অনুযায়ী, পাকিস্তানের জনগণকে ইসলামিক সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতার সরল দ্বৈততায় বিচার করা ঠিক নয়। তিনি মনে করতেন, কোনো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হলে সেই সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিফলন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র ও সংবিধানে থাকবে; আলাদাভাবে ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই। বরং ধর্ম ও রাষ্ট্রকে একীভূত করার চেষ্টা উভয়ের জন্যই ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, আবুল মনসুর আহমদকে বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তার ‘প্র্যাগম্যাটিক’ বা বাস্তববাদী চরিত্রটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, কৃষক প্রজা পার্টি থেকে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে তাঁর যাত্রা, বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান এবং আত্মজীবনীতে নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা—সব ক্ষেত্রেই তিনি কোনো স্থির মতাদর্শের চেয়ে জনগণের প্রয়োজন, বাস্তবতা ও রাজনৈতিক উপযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ১৯৫৬ সালের সংবিধান বিতর্কেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। আবুল মনসুর আহমদ তখন বলেছিলেন, পাকিস্তানের বড় সমস্যা হলো, ‘আমরা দুই জনগোষ্ঠী, কিন্তু আমাদের এক জাতি হতে হবে।’

মোহাম্মদ আজম বলেন, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান বিতর্কে আবুল মনসুর আহমদ লাহোর প্রস্তাবকে এমন একটি ফেডারেল ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে প্রদেশগুলোর স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা নিশ্চিত থাকবে। ১৯৭২ সালেও তিনি একই যুক্তি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে লাহোর প্রস্তাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; বরং তার বাস্তবায়ন হয়েছে। মোহাম্মদ আজমের মতে, আবুল মনসুর আহমদ যে সমস্যাগুলো নিয়ে লিখেছেন, তার অনেকগুলোই বাংলাদেশ এখনো অতিক্রম করতে পারেনি। এ কারণে তাঁর লেখা ও চিন্তার নিবিড়, একাডেমিক পাঠ বর্তমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

আবুল মনসুর আহমদ শুধু রাজনীতির সমস্যা চিহ্নিত করেননি, সেই সমস্যার সমাধানের পথও দেখিয়েছেন—এটাই তাঁর চিন্তার বড় বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন আবুল মনসুর আহমদ–গবেষক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, বাঙালি মুসলমানের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা, ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে আবুল মনসুর যে প্রশ্নগুলো তুলেছিলেন, সেগুলোর উত্তর খুঁজতে তাঁর লেখা নতুন করে পড়া জরুরি।

অনুষ্ঠানের আরেক আলোচক গীতিকবি ও সমাজ বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতা শুধু তাঁকে স্মরণ করার মধ্যে নয়, তাঁর চিন্তাকে বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজে প্রয়োগ করার মধ্যেই। ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আবুল মনসুর যে সতর্কতা দিয়ে গেছেন, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ধর্মের ব্যবহার থেকে মুক্ত রাখা জরুরি। আবুল মনসুর আহমদের চিন্তা থেকে এই মূল্যবোধগুলো ধারণ করতে পারলেই তাঁকে বর্তমানের রাষ্ট্র নির্মাণের লড়াইয়ে জীবন্ত রাখা সম্ভব।

আধুনিক বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অগ্রগণ্য হিসেবে পরিচিত আবুল মনসুর আহমদ ১৮৯৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ৮০ বছর বয়সে ১৯৭৯ সালের ১৮ মার্চ তিনি মারা যান। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’, ‘আত্মকথা’, ‘বেশী দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’, ‘শেরে বাংলা হইতে বঙ্গবন্ধু’, ‘বাংলাদেশের কালচার’, ‘গালিভারের সফরনামা’, ‘ব্যঙ্গরচনা’, ‘আয়না’, ‘ফুড কনফারেন্স’ প্রভৃতি। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক কৃষক, নবযুগ ও ইত্তেহাদ-এর তিনি সম্পাদক ছিলেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের যুক্তফ্রন্ট সরকারে তিনি প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫৭ সালে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সরকারে তিনি কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডেইলি স্টারের সাংবাদিক ও কবি ইমরান মাহফুজ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আবুল মনসুর আহমদের ছেলে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, জাতীয় নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিনসহ আরও অনেকে।

বিতর্ক প্রতিযোগিতায় কলেজ পর্যায়ের বিজয়ী হিসেবে ঢাকা কলেজের বিতার্কিক দল এবং বিজিত হিসেবে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের বিতার্কিকদের হাতে পুরস্কারের নগদ অর্থ, সম্মাননা ও বই তুলে দেন অতিথিরা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজয়ী দল ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং বিজিত দল হয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। ওই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকদের হাতে পুরস্কারের নগদ অর্থ, সম্মাননা ও বই তুলে দেওয়া হয়।