ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি বা টপ সয়েলের ব্যবহার কমাতে বিকল্প মাটির উৎস খুঁজছে সরকার। চলমান খাল খনন কর্মসূচি থেকে পাওয়া মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহার করা যায় কি না, শিগগিরই সেটার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। প্রাথমিকভাবে ছয়টি জেলায় এ উদ্যোগ পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক ফলোআপ সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় ছয়টি জেলা বাছাই করে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইটভাটার সংখ্যা ৮ হাজার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানাচ্ছে, এসব ইটভাটায় প্রতিবছর ছয় কোটি ঘনমিটার টপ সয়েল ব্যবহার করা হচ্ছে।

‘বাংলাদেশ: রিভাইটালাইজিং দ্য অ্যাগ্রিকালচারাল টেকনোলজি সিস্টেম’ শীর্ষক এক গবেষণায় বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ প্রতিবছর ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি হারাচ্ছে। ২০০৫ সালে করা এ গবেষণার উপাত্ত এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায় না। রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ও নগরায়নের কারণে কৃষিজমি হ্রাস পাচ্ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুর জেলাকে বাছাই করেছে। জেলার ইটভাটার সংখ্যা ও খননের জন্য চূড়ান্ত করার খালের দৈর্ঘ্যের হিসাবে এসব জেলা বাছাই করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে সরকারের যেসব সংস্থা খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তাদের সঙ্গে জেলা পর্যায়ে সভা করেছে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মোজাহিদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গত ৩১ আগস্ট ইটভাটা সমিতি ও খাল খননে যুক্ত সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সভা হয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, খাল খননের মাটিকে কাজে লাগিয়ে ইট তৈরি করা যায় কি না, সেটার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।

সরকার আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকারের তিন মন্ত্রণালয়ের চার সংস্থা প্রথম ধাপে ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন করবে। গত ২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার ও পুনঃখনন’ কর্মসূচির ওপর অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে কোন সংস্থা কত কিলোমিটার খাল খনন করবে, তার একটা রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত ১৮ জুলাইয়ের সভায় মাটি পুড়িয়ে ইট বানানোর প্রথা থেকে সরে এসে পাথর, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট তৈরি করা এবং সরকারি প্রকল্পে শতভাগ ব্লক ইট দিয়ে বাস্তবায়ন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

জানতে চাইলে সভায় অংশ নেওয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম-১–এর সহকারী প্রকৌশলী ইমতিয়াজ আকিব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অনেক সময় বৃষ্টির পানিতে খনন করা মাটির স্তূপ আবার নদী-খালে গিয়ে পড়ে। এ মাটি যদি ইটভাটায় দেওয়া যায়, সেটা তাদের জন্য ভালো। জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ৩১ আগস্টের সভায় কীভাবে এসব মাটি ইটভাটার মালিকদের সরবরাহ করা হবে, সে বিষয়ে একটি প্রক্রিয়া দাঁড় করানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান ইমতিয়াজ আকিব।

খাল খননের মাটি দিয়ে ইট বানানো কতটা টেকসই হবে, সেটা নির্ধারণে আগে মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা হবে। এরপর ইটভাটার মালিকেরা সন্তুষ্ট হলে এসব মাটি ইটভাটায় দেওয়া হবে ইজারার ভিত্তিতে।

বিস্তারিত জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা ছয়টি জেলা নির্বাচন করেছি। আমরা ইতিবাচক ফল পাব বলে আশা করছি।’

সাইদুর রহমান বলেন, খননের পর পাওয়া মাটি ভেজা থাকে। শুকানোর পর এ মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখা হবে। পরীক্ষার পর সব ঠিকঠাক পাওয়া গেলে এ মাটি দিয়ে ইট বানানোর কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, শীতকালে অনেক নদী অনেক দূর পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। এসব নদী থেকে ইটভাটার মালিকেরা যদি মাটি কেটে নিয়ে ইটভাটায় ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে ড্রেজিংয়ের খরচও কমে আসবে। এর ফলে কৃষিজমি ও পাহাড় কাটা বন্ধ করা যাবে বলে আশা করেন তিনি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আবিদ হোসাইন মানু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সমিতিতে ৪০০–এর মতো ইটভাটা আছে। প্রতিটি ভাটায় বছরে ৩০ লাখের মতো ইট তৈরি হয়। ফলে মাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। সরকারের এ সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য ভালো। আমরা দুই বছর ধরে কৃষিজমিতে হাত দিতে পারি না। পুকুর, ডোবার মাটি দিয়ে ইট বানাতে হচ্ছে। আমরা আশা করব, সরকার কম মূল্যে আমাদের এ মাটি সরবরাহ করলে ইটভাটার মালিকেরা আগ্রহী হবে।’