পূর্বাচলের নীলা মার্কেটের সংলগ্ন মাজার রোডে গড়ে ওঠা একটি কাঁচা বাজার এখন স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে গাড়ি নিয়ে কেনাকাটায় আসেন অনেক নাগরিক। বাজারের শুরুতে চার সদস্যের একটি দল টমেটো ও মিষ্টিকুমড়া দেখছিলেন। ভাঙা ইংরেজিতে জানান, চীন থেকে ঢাকায় আসার পর তিনিরা এখানে ঘুরতে আসেন এবং সাথে কিছু বাজারও করে নেন।
বাজারটিতে বড় দোকানের চেয়ে ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের প্রাধান্য বেশি। তারা নিজেদের জমিতে চাষ করা তাজা শাকসবজি নিয়ে প্রতিদিন হাজির হন। কেউ কেউ হেঁটে হেঁটে কলমিশাক, মালঞ্চশাক, কচুশাক, ঢেঁকিশাক, ঘেটকচুশাক ও তেলাকুচাশাক সংগ্রহ করেন। নিকটবর্তী এলাকা থেকে আসা পুঁইশাক, লাউশাক, মিষ্টিকুমড়া শাক ও চালকুমড়া শাকের প্রতি আঁটি ৩০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়। সাদা, লাল ও নীলাভ শাপলার প্রতি আঁটি ৪০ থেকে ৫০ টাকা। পুঁইশাক, লাউপাতা, মিষ্টিকুমড়ার পাতা ও চালকুমড়ার পাতা পাওয়া যায় প্রতি আঁটি ২০ টাকায়। পাঁচমিশালি শাকের দাম প্রতি আঁটি ৫০ টাকা। চুকুর বা টক পাতা, বিলাতি ধনে ও মিষ্টিকুমড়ার ফুলের প্রতি আঁটি ১০ টাকা। শজনেপাতা পাওয়া যায় ৫০ টাকায়।
চিচিঙ্গা, ঝিঙে, ধুন্দুল, ঢ্যাঁড়স, পটোল, আলু, বগুড়ার লাল আলু, বরবটি, টমেটো, কাঁকরোল, কচু, কচুর লতি, কচুমুখি, করলা, ডাঁটা, বেগুন, কাঁচা পেঁপে, শসা, গাজর, কাঁচা মরিচ, বোম্বাই মরিচ, কাঁচা চালকুমড়া ও মোরব্বা বানানোর উপযোগী পাকা চালকুমড়া সহজেই পাওয়া যায়। পুঁইশাকের বীজ ও কাঁঠালের বীজ কেজি দরে বিক্রি হয়। জাতভেদে লেবু পাওয়া যায় প্রতি ডজন ৭০ থেকে ১০০ টাকায়। শীতের সবজি শিমের দাম প্রতি কেজি ১৮০ টাকা। ভর্তার জন্য মৌ শিম পাওয়া যায় প্রতি কেজি ২০০ টাকায়।
বাজারে পাকা তালও রয়েছে। কালচে হলুদ রঙের ছোট ও বড় তালের দাম আকারভেদে ৩০ থেকে ৩০০ টাকা। আমের মৌসুম শেষ হলেও বারোমাসি থাই কাটিমন, বারি ৩ ও আশ্বিনা আম পাওয়া যাচ্ছে। পাকা আমের দাম ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। কাঁচা আমও রয়েছে। কাঁঠালের দাম আকারভেদে ১৫০ থেকে ৭০০ টাকা। ড্রাগন ফল, লটকন, আমড়া, দেশি পেয়ারা, থাই পেয়ারা, পাকা পেঁপে, করমচা, শরিফা, লুকলুকি, আমলকী, আপেল, দেশি সবুজ মাল্টা, কমলা, আনার, ডাব, কতবেল, তরমুজ, বাঙ্গি, বেল, জাম্বুরা ও চালতা সহ বিভিন্ন ফল বিক্রি হচ্ছে। চম্পা কলা, বাংলা কলা, নরসিংদীর সাগর কলা ও আনাজি কলা কলার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
দেশি জাতের হাঁস ও মুরগির প্রাধান্য এখানে বেশি। দেশি মুরগি ও হাঁসের দাম প্রতি কেজি ৭০০ টাকা। দেশি হাঁসের ডিম পাওয়া যায় প্রতি হালি ১০০ টাকায়। দেশি মুরগির ডিমের দাম প্রতি হালি ১২০ টাকা। কোয়েল পাখির ডিম পাওয়া যায় প্রতি হালি ৭০ টাকায়। গরুর দুধ পাওয়া যায় প্রতি লিটার ১০০ টাকায়।
রাস্তার দুই পাশে মাছের দোকান রয়েছে। স্থানীয় নদী ও পুকুরের দেশি শিং, কই, টাকি, চিংড়ি ও ছোট মাছের চাহিদা বেশি। দেশি শিংয়ের দাম প্রতি কেজি ৮০০ টাকা। কই পাওয়া যায় ১ হাজার ২০০ টাকায়। টাকি ৫০০ টাকায়, চিংড়ি ৯০০ টাকায় ও ছোট মাছ ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের মতো বড় পাইকারি বাজারের তুলনায় এখানকার দাম কিছুটা বেশি মনে হতে পারে। তবে মানুষ দূর থেকে কেন আসেন? কারণ বিষমুক্ত তরতাজা সবজি। অধিকাংশ সবজি মাঠ থেকে তোলা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাজারে পৌঁছায়, ফলে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকে। পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি আবাসন এলাকায় ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে এমনরা দিনের কাজ তদারকি শেষে ঢাকা ফেরার পথে এখান থেকে তাজা সবজি কিনে নেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিবার ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে নীলা মার্কেট বা পূর্বাচলের মুক্ত বাতাসে ঘুরতে আসেন এমনরাও ফেরার পথে এই বাজারকে বড় আকর্ষণ হিসেবে দেখেন।
কুড়িল বিশ্বরোড বিআরটিসি কাউন্টার থেকে বিআরটিসি বাসে ২০ টাকা ভাড়ায় বা মাত্র ৩০ টাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এই বাজারে যাওয়া যায়। নিজস্ব গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই। বাজার সপ্তাহের সাত দিনই দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা থাকে। যেকোনো একদিন সময় করে ঘুরে আসা যেতে পারে। বাজার শেষে ফেরার পথে মাটির তাওয়ায় বানানো চিতই পিঠার স্বাদ নিতে ভুলবেন না।