ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ২০২৬ ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬-এর সংসদীয় কমিটি পর্যালোচনায় কিছু ইতিবাচক সংশোধন আসলেও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের ক্ষমতার মৌলিক সীমাবদ্ধতাগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি দীর্ঘদিনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতার আলোকে বিল দুটি চূড়ান্ত করার আগে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার আহ্বান জানায়। টিআইবি আদিবাসী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বাধ্যবাধকতা, ঋণখেলাপি ব্যক্তিকে কমিশনার হওয়ার যোগ্যতা বাতিল, সামরিক ছাড়া অন্য আটককেন্দ্র পরিদর্শনে পূর্বানুমোদনের শর্ত বাদ দেওয়াসহ কতিপয় সুপারিশকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে।
তবে কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীন না রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকা, কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের কমিশনার হওয়ার সুযোগ, কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটিতে সরকারের প্রভাব এবং কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না করার মতো বিষয়গুলো কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।"
তিনি আরও জানান, "জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন নিজে সরাসরি অনুসন্ধান ও তদন্ত না করে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে, এমন বিধান বহাল রয়েছে। এতে কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।"
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল ২০২৬-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিন্তা প্রকাশ পেয়েছে। সংস্থাটির মতে, শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্তের দায়িত্ব অন্য বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে দেওয়া হয়েছে। অথচ অতীতে গুমের ঘটনায় বিভিন্ন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। একই প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ের মধ্যে থেকে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, তা বড় প্রশ্ন। স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের কারণে দুর্বল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত হলে ভুক্তভোগীরা স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
টিআইবি গুম প্রতিরোধের আইনটি আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আরও পূর্ণাঙ্গ করার আহ্বান জানিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও আইনের সংজ্ঞায় স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে বলে সংস্থাটি মনে করে। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনায় বিল দুটির মৌলিক দুর্বলতা সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ছিল। কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও অংশীজনদের চিহ্নিত মূল কৌশলগত উদ্বেগগুলো বহাল রয়েছে।"
বিল দুটি কণ্ঠভোটে তড়িঘড়ি পাস না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ধারা ও সংশোধনী নিয়ে সংসদের সব সদস্যের অর্থবহ আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, প্যারিস নীতিমালা, আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদ, অতীতের অভিজ্ঞতা এবং ভুক্তভোগীদের অধিকার বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা উচিত।"